নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদে গৃহঋণ এবং ফ্ল্যাটের ক্রেতা সংকটে চাপে পড়েছে দেশের আবাসন খাত। নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহার পাশাপাশি চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে রড, সিমেন্ট, সিরামিক ও ফার্নিচারসহ আবাসনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পে। এ পরিস্থিতিতে খাতটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামানো, আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল। তাঁর আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ খাতে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজালের মতে, আবাসন কেবল ব্যবসার বিষয় নয়; এটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ
নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিকে আবাসন খাতের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও ১২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু ব্যয় বাড়লেও একই অনুপাতে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো।
ড. আলী আফজাল বলেন, ফ্ল্যাট নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ক্রেতারা কয়েক বছর আগেই চুক্তি করে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেন। ফলে চুক্তির পর নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলেও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে হয়। বাড়তি ব্যয়ের চাপ তাই ব্যবসায়ীদেরই বহন করতে হচ্ছে।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে দীর্ঘদিন এ চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। এরই মধ্যে কিছু প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমেছে বলে জানান তিনি।
উচ্চ সুদে কমছে ফ্ল্যাটের ক্রেতা
রিহ্যাব সভাপতির মতে, ফ্ল্যাটের চাহিদা কমার পেছনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, গৃহঋণের উচ্চ সুদ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মানুষের ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায়নি; বরং বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাট কেনা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।
করোনাকাল থেকে আবাসন খাতের সংকট বাড়তে শুরু করে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগের অর্থ ও মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তাঁর ভাষ্য।
প্রভাব পড়ছে ২৭০টি শিল্পে
আবাসন খাতের মন্দা শুধু ফ্ল্যাট নির্মাতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রড, সিমেন্ট, সিরামিক, ফার্নিচারসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্পের ব্যবসাও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে জানান ড. আলী আফজাল।
ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে এসব শিল্পের পণ্যের চাহিদা ও বিক্রি কমে যায়। উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হতে পারে। এভাবে আবাসন খাতের সংকট বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
রিহ্যাব সভাপতির দাবি, দেশের আবাসন খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রকল্প কমে যাওয়া ও নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত কতজন চাকরি হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই।
নিবন্ধন ব্যয় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর-ফি ক্রেতাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর ভাষ্য, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর-ফি মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ফ্ল্যাটের মূল দামের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ যোগ হওয়ায় অনেকের পক্ষে বাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেকে ফ্ল্যাট কেনার পরও নিবন্ধন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেন। প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা এবং ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে।
ঢাকায় ৫, গ্রামাঞ্চলে ১ শতাংশ সুদের প্রস্তাব
মধ্যবিত্তের আবাসন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, সুদ কমানো গেলে ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য বাড়বে এবং বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি হবে।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, অঞ্চলভেদে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে গৃহঋণের সুদহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদে, জেলা শহরে আরও কম সুদে এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়া গেলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
পাশাপাশি আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক অঙ্কের সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এতে চলমান প্রকল্প শেষ করা এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি জমিতে সাশ্রয়ী আবাসন
আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ সরকারি সেবাগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রস্তাব দিয়েছেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় এবং ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে দেয়।
সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও জোর দেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব, নতুন আবাসন নির্মাণে নির্বিচারে কৃষিজমি ব্যবহার না করে অব্যবহৃত সরকারি জমি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারি জমির সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও দক্ষতা যুক্ত হলে তুলনামূলক কম খরচে আবাসন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে।
ঢাকার বাইরে বসবাসের সুযোগ বাড়াতে রাজধানীর আশপাশের জেলা ও উপজেলার সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। যাতায়াত সহজ হলে ঢাকার বাইরে বসবাসে আগ্রহ বাড়বে এবং রাজধানীর আবাসন চাহিদার ওপর চাপ কমতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিসহায়তা
আবাসন খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারি সহায়তার সুফল পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ ও স্বল্প সুদে অর্থায়নের উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. আলী আফজালের মতে, নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, গৃহঋণের সুদ কমানো এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে আনার পাশাপাশি অনুমোদনপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবাসন খাতে নতুন গতি ফিরতে পারে।
তিনি মনে করেন, সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগে সাশ্রয়ী অর্থায়ন ও পরিকল্পিত নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ফ্ল্যাটের বাজারে চাহিদা বাড়বে, সংযুক্ত শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।