ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কোথায় আছেন ড. ইউনূস
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতেই অবস্থান করছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর আপাতত সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর আরও তিন মাস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় থাকার সুযোগ থাকলেও অধ্যাপক ইউনূস সেই সুযোগ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ প্রেক্ষিতে গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) যমুনা পরিদর্শন করেছে।
অধ্যাপক ইউনূসের ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি যমুনায় পরিবারকে সময় দিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। মাসখানেকের মধ্যে অথবা ঈদের পর তিনি গুলশানে নিজের বাসভবনে ফিরে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এখনও নির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বসবাস করে আসছেন তিনি।
ড. ইউনূসের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানান, ইউনূস সেন্টারে ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি বর্তমানে নথিপত্র গোছানো ও সাংগঠনিক বিভিন্ন কাজ করছেন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে অসুস্থ স্ত্রীকে সময় দিচ্ছেন তিনি। ওই সহযোগী আরও জানান, ইউনূস সেন্টারে ফেরার প্রাথমিক কাজের পাশাপাশি তিনি কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এবং তরুণদের জন্য নতুন কিছু উদ্যোগ নিয়ে ভাবছেন। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধ্যাপক ইউনূসের দীর্ঘদিনের ‘থ্রি জিরো’ ভিশন-শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ-এই ধারণার ভিত্তিতেই সম্ভাব্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারিত হয়নি।
বিদেশ সফরের জন্যও বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পাচ্ছেন অধ্যাপক ইউনূস। এসব সফর সংক্রান্ত বিষয়ে তাকে সহায়তা করছেন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক সাবেক প্রধান সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ। কোন সফরে তিনি সশরীরে অংশ নেবেন এবং কোন ক্ষেত্রে ভার্চুয়ালি বক্তৃতা দেবেন-সে বিষয়গুলোও নির্ধারণ করা হচ্ছে।
যমুনায় অবস্থানকালীন আগের মতো ব্যস্ত সময় না কাটালেও অধ্যাপক ইউনূস প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কম্পাউন্ডের ভেতরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেন। নাশতার পর সকাল ১০টার দিকে তার দৈনন্দিন কাজ শুরু হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন-যারা তার সঙ্গে দেখা করতে চান, তাদের যেন সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট আরেকজন জানান, অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন-আগে রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি, এখন তিনি সবার কথা শুনতে চান। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। কেউ অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা জানতে চান, কেউ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান, আবার কেউ পেশাগত ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন।
আগামী মাসে পাঁচ দিনের সফরে জাপানে যাওয়ার কথা রয়েছে অধ্যাপক ইউনূসের। সফরের বিস্তারিত কর্মসূচি পরে জানানো হবে বলে তার এক সহযোগী জানিয়েছেন।
সবকিছুর বাইরে বর্তমানে অধ্যাপক ইউনূসের মনোযোগ পরিবারের দিকেই বেশি। অফিসের কাজ শেষে তিনি অসুস্থ স্ত্রীর পাশে সময় কাটাচ্ছেন। বিকেল ৫টার দিকে আবারও কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেন। সন্ধ্যার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি মেয়ের দুটি বিড়াল ‘মিনু’ ও ‘কায়রো’র সঙ্গেও সময় দেন তিনি।
এদিকে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অধ্যাপক ইউনূস তার কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তিনি পাসপোর্টটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন।
শুধু প্রধান উপদেষ্টা নন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার পদমর্যাদার অনেকেই ইতোমধ্যে তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ছাড়াও উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার পদমর্যাদার মিলিয়ে প্রায় ২০ জন কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনার পর ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বিএনপি সরকার গঠন করে। তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।