রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক বয়ান: দেড় বছরের ‘প্রাসাদবন্দি’ জীবন, জরুরি অবস্থা চাপ ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নেপথ্য কাহিনি
দেড় বছর ধরে যেন এক অদৃশ্য বন্দিদশায় ছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সেই সময় পেরিয়ে আজ মুক্ত অনুভূতির জায়গা থেকেই তিনি তুলে ধরলেন রাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম সংকটময় অধ্যায়ের অজানা ও রোমহর্ষক অন্তরালের গল্প। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, জরুরি অবস্থা জারির চাপ, সামরিক শাসনের গুঞ্জন এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ঘিরে চলা মানসিক নিপীড়নের বিস্তারিত বিবরণ। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দুই ভাগে প্রকাশ করছে কালের কণ্ঠ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন।
৫ আগস্ট: ৩০ মিনিটে বদলে যায় রাষ্ট্রের চিত্র
রাষ্ট্রপতি বলেন, আন্দোলন যে জনবিস্ফোরণে রূপ নেবে, তা কেউ আঁচ করতে পারেননি। দুপুরের দিকে তাঁকে জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসতে পারেন। হেলিকপ্টার প্রস্তুত থাকায় পরিস্থিতির ভয়াবহতা তখনই স্পষ্ট হয়। কিন্তু সাড়ে ১২টার দিকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী আর আসছেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি দেশ ছেড়েছেন। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, মাত্র ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও জরুরি অবস্থা বিতর্ক
বিকেল তিনটার দিকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাষ্ট্রপতিকে ফোনে সার্বিক পরিস্থিতি জানান। পরে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে এসে বৈঠকে বসেন।
রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে বলেন, সামরিক আইন বা জরুরি অবস্থা জারির কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে জরুরি অবস্থা জারির জন্য তীব্র চাপ দেওয়া হয়েছিল। দেশি–বিদেশি সুযোগসন্ধানী শক্তি পরিস্থিতিকে অসাংবিধানিক পথে নিতে চেয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তবে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানরা এ বিষয়ে ছিলেন দৃঢ়ভাবে বিরোধী। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন: সংবিধানিক সংকট ও সমাধান
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ছিল একটি সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ। সংবিধানের ৭ ও ৭-ক অনুচ্ছেদের কারণে বিষয়টি রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে পড়তে পারত।
এই সংকটে তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের মতামত চান। আদালতের মতামতের ভিত্তিতেই তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন, যা তাঁর জন্য ‘রক্ষাকবচ’ হয়ে ওঠে।
প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন ও ড. ইউনূস প্রসঙ্গ
রাষ্ট্রপতি জানান, ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-কেই প্রধান উপদেষ্টা করার বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান ছিল। চিকিৎসাজনিত কারণে তিনি বিদেশে থাকায় সরকার গঠনে বিলম্ব হয়।
বিকল্প হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় এলেও ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের প্রশ্নে অনড় থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর দেশে ফেরার পরই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়।
মব সন্ত্রাস, জাতীয় সংগীত বিতর্ক ও রাষ্ট্রপতির অসহায়ত্ব
রাষ্ট্রপতি স্বীকার করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মব সন্ত্রাস ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে পরিস্থিতি এতটাই অস্থির ছিল যে তখন কঠোর ব্যবস্থা নিলে উল্টো পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কার্যত নীরব ছিল। নিজেও তিনি অনেক ক্ষেত্রে অসহায় বোধ করেছেন।
তারেক রহমান ও নির্বাচিত সরকারের মূল্যায়ন
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির মন্তব্য, তাঁর মধ্যে রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি রয়েছে। অল্প সময়ের পরিচয়েই তিনি আশাবাদী হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, “মর্নিং শোজ দ্য ডে-এই কয় দিনের কার্যক্রমেই ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়।”
‘প্রাসাদবন্দি’ জীবনের অভিযোগ
রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাঁকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান এবং বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি-সব ক্ষেত্রেই বাধার মুখে পড়েন।
তিনি জানান, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে চিকিৎসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য করা।
রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার প্রশ্নে অবস্থান
বিদেশি গণমাধ্যম রয়টার্স-এ দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর কথা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি সাংবিধানিকভাবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে আছেন। তবে নির্বাচিত সরকার চাইলে তিনি সম্মানজনকভাবে সরে যেতে প্রস্তুত।