জামায়াত কি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিকার, নাকি আস্থাহীনতার রাজনীতিতে আটকে পড়া এক শক্তি?
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা, প্রত্যাশা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার-হাইপ তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের একটি সুস্পষ্ট অমিল চোখে পড়েছে। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি-সমর্থিত ১১ দলীয় জোটকে ঘিরে এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে তারা অভূতপূর্ব বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ভোটের ফল সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। এই ব্যবধান থেকেই জামায়াতের সমর্থকদের একটি অংশ অভিযোগ তুলেছে-তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং করে হারানো হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষকদের বক্তব্য ভিন্ন; তাদের মতে, ইঞ্জিনিয়ারিং না থাকলে জামায়াতের মতো তুলনামূলক সীমিত সামাজিক ভিত্তির একটি দলের পক্ষে এত আসন পাওয়াই সম্ভব হতো না।
এই দুই বিপরীত দাবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো-জামায়াতের নির্বাচনি ফল কি কেবল কারিগরি হস্তক্ষেপের ফল, নাকি এর পেছনে কাজ করেছে সমাজের গভীরে প্রোথিত রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব, ভীতি, স্মৃতি ও আস্থাহীনতা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত জামায়াতের ভোট-আচরণ, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটের ধারা, নেতৃত্ব কাঠামো, সংগঠনগত সক্ষমতা, ডিজিটাল বিভ্রম, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং জোট রাজনীতির বাস্তবতা-সবকিছুকে একত্রে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ নির্বাচন কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি সমাজের গভীর মনোভূমির প্রতিফলন।
নারী ভোট: শরীর-রাজনীতি ও প্রতীকী ভয়ের বাস্তবতা
২০২৬ সালের নির্বাচনে নারী ভোটারদের ভূমিকা একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। জামায়াত তাদের প্রচারে নারী প্রশ্নকে গুরুত্ব দিলেও বাস্তবে সেটি দলের জন্য সুবিধার বদলে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বে একে বলা হয় ‘শরীর-রাজনীতি’-যেখানে নারীর দেহ, পোশাক, চলাফেরা ও সামাজিক ভূমিকা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক Pierre Bourdieu-এর ‘প্রতীকী ক্ষমতা’ তত্ত্ব এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার মতে, ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, ভাষা, আচরণ ও সাংস্কৃতিক সংকেতের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়।
জামায়াত-সমর্থিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা, নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কটাক্ষ এবং নারীবিরোধী মন্তব্য নারীদের মধ্যে একটি গভীর প্রতীকী ভীতি তৈরি করে। এই ভীতি বাস্তব নীতির চেয়েও ভবিষ্যৎ আশঙ্কার ওপর দাঁড়িয়ে। অনেক নারী ভোটারের মনে দৃঢ় ধারণা জন্মায়-জামায়াত ক্ষমতায় এলে তাদের পোশাক, কর্মজীবন ও সামাজিক স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। নারী কর্মীদের বড় র্যালি জামায়াতের কাছে শক্তির প্রদর্শন মনে হলেও অনেক নারীর কাছে এটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক অস্বস্তির প্রতীক। ফলে নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ জামায়াত থেকে দূরে সরে যায়-যা দলটির আসনসংখ্যা বাড়লেও প্রত্যাশিত বিজয়কে অসম্ভব করে তোলে।
সংখ্যালঘু ভোট ও নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে এই ভোটের বড় অংশ বিএনপির দিকে গেলেও জামায়াতের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস কাটেনি। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রতি সংখ্যালঘুদের শঙ্কা নতুন নয়, এবং জামায়াত সেই আস্থার দেয়াল ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেতৃত্ব সংকট। ভোটাররা জানে-বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কে প্রধানমন্ত্রী, কে অর্থনীতি সামলাবেন। জামায়াতের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট উত্তর ছিল না। রাষ্ট্র পরিচালনার মুখ কে-এই অনিশ্চয়তা ভোটারদের আস্থাহীন করেছে।
ডিজিটাল বিভ্রম ও মাঠের বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত সমর্থকদের উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতি একটি ‘ডিজিটাল বুদবুদ’ তৈরি করে। অনলাইনের এই উচ্ছ্বাস বাস্তব মাঠের সংগঠনগত দুর্বলতাকে আড়াল করে দেয়। ফলে প্রত্যাশা বাড়ে, কিন্তু ভোটের দিনে সেই প্রত্যাশা বাস্তবতায় রূপ নেয় না। অনেক ভোটার, যারা সাধারণত ভোট দিতে আগ্রহী নন, তারা এবার জামায়াত ঠেকানোর জন্য ভোটকেন্দ্রে গেছেন-যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধ, রক্ষণশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে জামায়াত এখনো নিজেকে জাতীয় ঐকমত্যের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বরং দলের কিছু সমর্থকের বক্তব্য ও আচরণ জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি হিসেবে পুনরায় চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে রক্ষণশীল ধারার একটি অংশও মতাদর্শগত কারণে জামায়াত থেকে দূরে থেকেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভারতের নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গিও জামায়াতের চারপাশে একটি কূটনৈতিক সন্দেহ তৈরি করেছে-যার প্রতিফলন দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবেশেও পড়েছে।
ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, আস্থার সংকটই মূল ব্যাখ্যা
সবকিছু মিলিয়ে জামায়াতের নির্বাচনি ফলাফলকে কেবল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে বাস্তবতার বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। নারী ভোটারদের ভীতি, সংখ্যালঘুদের অবিশ্বাস, নেতৃত্বের অস্পষ্টতা, সংগঠনগত দুর্বলতা, ডিজিটাল বিভ্রম, মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে অস্বস্তি এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে জামায়াত একটি বড় রাজনৈতিক আস্থার সংকটে আটকে আছে। জামায়াত ভোট পায়, কিন্তু আস্থা পায় না; সমর্থক জোগাড় করে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বিশ্বাস তৈরি করতে পারে না। এই ব্যবধানই তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা।
ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অগ্রগতি চাইলে জামায়াতকে শুধু নির্বাচনি কৌশল নয়, বরং নিজেদের নেতৃত্ব, নীতি, সামাজিক অবস্থান ও জাতীয় ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। এই পুনর্গঠন ছাড়া বড় রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন তাদের জন্য কঠিনই থাকবে।