ঝিনাইদহ-২ (সদর-হরিণাকুণ্ডু) আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে আসনটিতে দলটির শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই দুর্গেই বড় ধাক্কা খেয়েছে বিএনপি।
এবার এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ও জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামী-র প্রার্থী ও জেলা আমির আলী আজম মো. আবু বকরের কাছে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পড়ে এক লাখ ৯৫ হাজার ৭০২টি, আর ধানের শীষ পায় এক লাখ ৭৫ হাজার ৯৮৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান ১৯ হাজার ৭১৮।
জেলার চারটি আসনের মধ্যে ঝিনাইদহ-২ আসনেই এবার সর্বোচ্চ ভোট কাস্ট হয়েছে। পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন তিন লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৫ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৭৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এত বিপুল ভোটের পরও বিএনপির পরাজয় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও বিস্ময় তৈরি করেছে।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার টাওয়ারপাড়া এলাকার বাসিন্দা গৃহকর্মী আম্বিয়া খাতুন বলেন, তিনি সারাজীবন ধানের শীষে ভোট দিলেও এবার প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ধর্মীয় বক্তব্যের কারণে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। একই উপজেলার শিংগা গ্রামের কৃষক আকুল হোসেন জানান, আগে বিএনপিতে ভোট দিলেও এবার দলটিরই একজন পুরোনো কর্মীর পরামর্শে জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন। ওই গ্রামের বিএনপি কর্মী দাউদ আলীর দাবি, দলের ভেতর থেকেই অনেকেই গোপনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ জেলার চারটি আসনেই জয় পেলেও সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তায় বিএনপি এগিয়ে ছিল। জামায়াত সাধারণত তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এমন পরাজয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দেরিতে প্রার্থী ঘোষণা, জোট বনাম দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিভ্রান্তি, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল-সব মিলিয়েই পরাজয় ডেকে এনেছে। উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ জানান, মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ মুহূর্তে প্রার্থী ঘোষণার কারণে মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়নি।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মোমিন বলেন, দলের ভেতরে গোপন বিরোধিতা এবং প্রার্থীকে অন্য আসনের দায়িত্ব দেওয়ায় নিজের এলাকায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি তিনি। স্থানীয় শিক্ষাবিদ আনিচুর রহমানের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দুটি বলয়ের দ্বন্দ্ব পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে বিএনপি নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, এই পরাজয়ের পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রও ছিল। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তাইজাল হোসেন বলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে সংগঠনকে শক্তিশালী করা হবে।
পরাজিত প্রার্থী এম এ মজিদ অভিযোগ করেন, দলের ভেতরে ও বাইরে থেকে কালো টাকা ছিটিয়ে ধানের শীষের বিপক্ষে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অন্যদিকে বিজয়ী প্রার্থী আলী আজম মো. আবু বকর দাবি করেন, জামায়াতের নেতাকর্মীদের সততা ও সংগঠিত প্রচারণার কারণেই ভোটাররা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন।