চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং স্থগিত করা হয় দলীয় নিবন্ধন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ।বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি এখন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের কৌশল নিয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপাতত সহিংসতা এড়িয়ে সীমিত পরিসরে সংগঠন গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি। রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল হলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠনের প্রস্তুতিও রয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অতীতে যেসব নেতার কারণে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের আর নেতৃত্বে না রাখার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। পুরোনো বিতর্কিত মুখ বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আওয়ামী লীগে এখনো শেখ হাসিনা-কেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে দেখা হয়। তবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিকল্প নেতৃত্ব সামনে আনার প্রশ্নটি দলীয় হাইকমান্ডে আলোচিত হচ্ছে। দলটির একাধিক নেতা জানান, ‘শেখ পরিবার’-কেন্দ্রিক নেতৃত্ব কাঠামো বহাল রাখার প্রবণতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা পেছন থেকে নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় থাকতে পারেন, আর সামনে আনা হতে পারে নতুন কোনো মুখ।
এর আগে জানুয়ারিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, শেখ হাসিনা হয়তো আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন না এবং অবসর নেওয়ার ইচ্ছা আগেই প্রকাশ করেছিলেন। তবে দলের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে এখনো বলছেন, শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
একজন সাংগঠনিক সম্পাদক জানান, দলীয় কার্যালয় খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে আসছেন, প্রবাসে থাকা নেতাদের একটি অংশও দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে বড় কোনো কর্মসূচির আগে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা মনে করছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। ফলে দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
অন্যদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আইন অনুযায়ী যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই বিষয়টি বিবেচিত হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান জানান, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না এবং আইনের শাসনের মধ্যেই রাজনীতি পরিচালনা করতে চায়।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ এখন দ্বৈত কৌশলে এগোচ্ছে-একদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অটুট রাখার বার্তা, অন্যদিকে বাস্তবতা বিবেচনায় বিকল্প নেতৃত্ব সামনে আনার সম্ভাবনা খোলা রাখা। তবে কার্যকরভাবে রাজনীতিতে ফিরতে সরকারের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ‘স্পেস’-এর অপেক্ষায় রয়েছে দলটি।