মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জ্বালানি খাতে নতুন অনিশ্চয়তা, এলএনজি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এ পথ অতিক্রম করে। চলমান উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তে শুরু করেছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছিল ৬১ ডলার, যা বেড়ে ৬৭ ডলারে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক হামলার পর দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতও সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে। বর্তমানে দেশের গ্যাস চাহিদার ৩০ শতাংশের বেশি পূরণ হচ্ছে আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে, যার বড় অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। কাতার থেকে এলএনজি আমদানির একমাত্র সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। এ রুটে বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে কিছু কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও অধিকাংশ চালান হরমুজ অতিক্রম করেছে। বিদ্যমান মজুত ও পাইপলাইনে থাকা সরবরাহ দিয়ে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সংঘাত দীর্ঘ হলে এলএনজির মূল্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে এবং আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, তাদের কাছে প্রায় ১৫ দিনের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভর্তুকির চাপ বাড়বে। প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানিবাহী জাহাজের ভাড়া ও বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে শিল্প খাতে উৎপাদন খরচও বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে দ্রব্যমূল্যে। সামনে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে সরকার।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামষ্টিক অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।