হরমুজ প্রণালি বন্ধ, আমদানি-রপ্তানিতে অচলাবস্থা; চাপে ব্যবসা খাত
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণের পর হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করার পর সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আকাশপথেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।
ইরানের ঘোষণার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব দেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।
হাজারের বেশি কনটেইনার আটকা
ইরানের ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার বুকিং স্থগিত করেছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি ডিপো এবং বিদেশের একাধিক বন্দরে এক হাজারের বেশি কনটেইনার আটকা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক শিপিং প্রতিষ্ঠান Mediterranean Shipping Company–এর বাংলাদেশ কার্যালয় জানিয়েছে, তাদের শতাধিক কনটেইনার আটকে আছে এবং নতুন বুকিং নেওয়া হচ্ছে না।
খাদ্যপণ্য, পানীয়, তৈরি পোশাক ও হিমায়িত মাছের চালান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত শতাধিক কনটেইনার হিমায়িত মাছ বন্দরে ও কারখানায় পড়ে আছে।
দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানিয়েছে, তাদের প্রায় ৬০০ কনটেইনার রপ্তানি পণ্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে আটকা রয়েছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যাল আমদানিও বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রপ্তানি আদেশ স্থগিত
মধ্যপ্রাচ্যগামী বেশ কয়েকটি রপ্তানি চালান জাহাজে ওঠার আগেই খালাস করে ডিপোতে সরিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নতুন করে পণ্য না পাঠাতে অনুরোধ জানিয়েছে। এতে তৈরি পোশাক খাতের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিশেষভাবে চাপে পড়েছেন।
জ্বালানি ঝুঁকিও সামনে
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে। কেরোসিন ছাড়া অন্যান্য জ্বালানির মজুত সীমিত সময়ের জন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুদ্ধের ব্যাপ্তি বড় আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আমদানি-রপ্তানি ও জ্বালানি-দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।
অন্যদিকে সানেম–এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি সংকট মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট দ্রুত নিরসন না হলে দেশের রপ্তানি খাত, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।