দেশজুড়ে খাল খনন, পুনঃখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশনা থাকলেও মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় একটি খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করে পার্ক তৈরির উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খালের ওপর কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণের ফলে ভবিষ্যতে এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু গাংনী পৌরসভার মালসাদহ মহল্লার দহ খাল। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে খালটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বৃষ্টির পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে খালের ওপর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর শাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি (আইইউজিআইপি) এর আওতায় ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৮ হাজার ৭২২ টাকা ব্যয়ে দহ খাল এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধন ও ল্যান্ডস্কেপিং প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে খালের ওপর কংক্রিট কাঠামো, হাঁটার পথ, বসার স্থানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সৌন্দর্যায়নের নামে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত করা হচ্ছে। তাদের মতে, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের একমাত্র কার্যকর পানি নিষ্কাশনের পথ এই খালটি। খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা হলে বর্ষা মৌসুমে ফসলি জমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। মালসাদহ এলাকার এক বাসিন্দা জানান, অতীতে খালটিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এবং স্থানীয় মানুষ গবাদিপশুর গোসলসহ নানা কাজে এটি ব্যবহার করতেন। তবে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে খালটি ধীরে ধীরে দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে। এখন পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় খালটির অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
স্থানীয় কৃষক কুদ্দুস বলেন, আশপাশের জমিতে ব্যাপক পাট চাষ হয়। খালের পাড় উঁচু করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে পাট জাগ দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে, এতে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। পরিবেশ সচেতনদের মতে, সরকারি খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও জলাধার সংরক্ষণ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এতে খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি সরকার গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ শাখা-২ থেকে জারি করা এক চিঠিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান একটি খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগকে নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। মালসাদহ এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী দাবি করেন, ১৯৬২ সালের এসএ রেকর্ডে জমিটি নদী হিসেবে উল্লেখ ছিল। পরে আরএস রেকর্ডে কয়েকজন ব্যক্তি সেটি নিজেদের নামে নথিভুক্ত করেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের করা মামলায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রায় ৩৫ বিঘা জমি দখলমুক্ত করা হয়। তবে এখনো রেকর্ড সংশোধন হয়নি এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জমির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার কথা রয়েছে।
তার অভিযোগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পার্ক নির্মাণের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ না এলেও স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রভাবে পৌরসভা থেকে থোক বরাদ্দ দিয়ে খালের অবশিষ্ট অংশে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চলছে। এতে গাংনী উপজেলার চেংগাড়া ও মালসাদহসহ আশপাশের সাত থেকে আটটি গ্রামের ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গাংনী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শামীম রেজা। তিনি বলেন, খালের অস্তিত্ব বজায় রেখেই পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং পানিপ্রবাহ সচল রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দখল নয়, বরং সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান বলেন, সরকার যেখানে খাল সংরক্ষণ ও পুনঃখননের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে একটি খালের ওপর ১৪ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ উদ্বেগজনক। এতে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সাত দিনের মধ্যে প্রকল্পটি বাতিল না করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।