বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তার নাম প্রস্তাব করা হলে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়। বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন এবং খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম তা সমর্থন করেন।
এর মধ্য দিয়ে দেশের আইনসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব গ্রহণ করলেন ৮১ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি খেলাধুলা, সামরিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ-সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে ক্রীড়াঙ্গনেই তিনি প্রথম পরিচিতি পান। পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দল এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হয়ে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছিলেন তিনি। গতি, দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে ফুটবল অঙ্গনে দ্রুতই নিজের জায়গা করে নেন। দেশের ঘরোয়া ফুটবলেও তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে দীর্ঘদিন অধিনায়কত্ব করেন। মাঠে তার পারফরম্যান্স ও গোল করার ক্ষমতা সমসাময়িক ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত ছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে কিছু সময়ের জন্য খেলাধুলা থেকে দূরে থাকলেও স্বাধীনতার পর তার অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়। বীরত্বের জন্য তিনি ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত হন এবং ১৯৭৩ সালে পান জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। খেলাধুলার পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সেও সাফল্য ছিল তার। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় একাধিকবার দ্রুততম মানব হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে তার সাফল্য ছিল আলোচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলতে গিয়ে তিনি ‘ব্লু’ পদকও অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দল, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো দলেও খেলেছেন তিনি। স্বাধীনতার পর ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবলে এক ম্যাচে ডাবল হ্যাটট্রিক করার বিরল কৃতিত্বও রয়েছে তার ঝুলিতে। পাকিস্তান আমলে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়াও ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য অর্জন।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পরও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সহ-সভাপতি এবং ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন। সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন ‘সোনালী অতীত ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজনও তিনি। ২০০৪ সালে ফিফা অর্ডার অব মেরিট পুরস্কারে ভূষিত হন।
পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হন মেজর হাফিজ। আশির দশকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
সর্বশেষ ভোলা–৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফুটবল মাঠে গোল করে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ভাসানো এই মানুষটি এখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন পরিচালনার দায়িত্বে। খেলাধুলা, মুক্তিযুদ্ধ, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তার নতুন দায়িত্বকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।