ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হওয়ার পরই ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। পরে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বন্ধ রাখার জন্য তারা স্পিকারের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। তবে সে অনুরোধ গ্রহণ না করায় তারা প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশন ত্যাগ করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশন নানা কারণে আলোচনায় এসেছে। নতুন সংসদে প্রায় ৭৬ শতাংশ সদস্যই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে স্পিকারের আসন শূন্য রেখে অধিবেশন শুরু হওয়া এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় প্রধান বিরোধী দলের ওয়াকআউট ঘটনাটিও বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পূর্ববর্তী সরকার জাতীয় সংসদকে কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ দেয়নি এবং সংসদকে অকার্যকর করে তুলেছিল। তিনি বলেন, নতুন সংসদকে জাতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করতে চায়।
নতুন সংসদে নির্বাচিত ২৯৬ সদস্যের মধ্যে ২২৭ জনই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। ফলে সংসদের কার্যপ্রণালি, বিধিবিধান, স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম এবং আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া বুঝতে নতুন সদস্যদের কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবারের সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ ও এনসিপির মতো দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও এই প্রথম সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্ব ও বিপুলসংখ্যক নতুন সদস্য নিয়ে গঠিত এই সংসদ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। সংসদ সদস্যরা যদি দ্রুত সংসদীয় বিধিবিধান আয়ত্ত করতে পারেন, তাহলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ত্রয়োদশ সংসদের আরেকটি ব্যতিক্রম হলো আগের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার ছাড়া প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়া। সাধারণত বিদায়ী স্পিকার নতুন সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করেন এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর তার দায়িত্ব শেষ হয়। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করার পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি এবং সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু একটি মামলায় কারাগারে থাকায় স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখেই অধিবেশন শুরু হয়।
পরে সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে শপথ নেন এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন কায়সার কামাল। দীর্ঘ সময় পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। অতীতের তিনটি সংসদ নিয়ে একতরফা নির্বাচন ও কার্যকর বিরোধী ভূমিকা না থাকার অভিযোগ থাকলেও এবার নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের দাবি তুলে জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যদের তাঁর ভাষণে বাধা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে জামায়াত নেতারাও আগে থেকেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শুরু হওয়ার পরই বিরোধী সদস্যদের ওয়াকআউটের মাধ্যমে সেই অবস্থান প্রকাশ পায়।