দফায় দফায় সময় পিছিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে উৎপাদনের পথে এগোচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী এপ্রিল মাসে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে, রূপপুর কেন্দ্র চালু হলে তেল ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং দেশের জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা বাড়বে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল মাসে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের পর পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হবে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মে মাসে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ২৩০ মেগাওয়াট, জুন-জুলাইয়ের মধ্যে ৩৭৫ থেকে ৪৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এরপর আগস্টে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ৭৮৭ মেগাওয়াট এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৯৯১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে নভেম্বর-ডিসেম্বর নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এপ্রিলের মধ্যেই ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী ৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ফুয়েল লোডিং শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফুয়েল লোডিং শেষ হলে জুন-জুলাই মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে এবং সেখান থেকেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রটি প্রায় এক বছর ধরে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও বিভিন্ন কারণে উৎপাদনে যেতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা তৈরি করেছিল। অর্থ লেনদেন, যন্ত্রপাতি আমদানি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা দেখা দেয়।
এছাড়া প্রকল্পটির সময়সূচিও একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথম পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২১ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২২ সালে চালু হওয়ার কথা ছিল। পরে তা কয়েক দফা পিছিয়ে যায়। ফলে পরিকল্পনার তুলনায় অন্তত চার বছর দেরিতে উৎপাদনে যাচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় নির্মিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট, অর্থাৎ পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রটি থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রোসাটম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রকল্পটি উল্লেখযোগ্যভাবে বিলম্বিত হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। তবে কেন্দ্রটি চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।