প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে ওই রাতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ওই পরিস্থিতিতে সরাসরি অ্যাকশনে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত বলেই পুলিশ সংযত ছিল।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ওই রাতে পুলিশের অ্যাকশনে না যাওয়ার মূল কারণ ছিল মানবজীবনের ঝুঁকি। তার ভাষায়, বড় ধরনের একটি ঘটনার পরও কোনো মানবিক প্রাণহানি না হওয়াই পুলিশের একটি বড় অর্জন।
তিনি বলেন, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়তো পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু একটি মানবজীবন হারিয়ে গেলে তা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না। সে কারণেই পুলিশ সেখানে সরাসরি অ্যাকশনে যায়নি।
অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম জানান, এই হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন - মো. নাইম, মো. আকাশ আহমেদ সাগর, মো. আব্দুল আহাদ, মো. বিপ্লব, মো. নজরুল ইসলাম মিনহাজ, মো. জাহাঙ্গীর, মো. সোহেল রানা, মো. হাসান, রাসেল ওরফে শাকিল, মো. আব্দুল বারেক শেখ আলামিন, রাশেদুল ইসলাম, সোহেল রানা, শফিকুল ইসলাম, মো. প্রান্ত ওরফে ফয়সাল আহমেদ প্রান্ত, আবুল কাসেম, রাজু হোসাইন ও মো. সাইদুর রহমান।
গ্রেপ্তারদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খোঁজার বিষয়টি পুলিশের বিবেচনায় নেই। তাদের দুষ্কৃতিকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং তারা আইন ভঙ্গ করেছে। প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার আওতায় তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে—তারা যে দলেরই হোক বা যে মতেরই হোক।
‘মব ভায়োলেন্স’ ঠেকাতে ডিএমপি কতটা সক্ষম—এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সক্ষম হলেও সব ঘটনা সবসময় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না। কারওয়ান বাজারের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। সেখানে অ্যাকশনে গেলে গুলি চলতে পারত এবং প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের ওপর পাল্টা হামলার সম্ভাবনা থাকায় সে রাতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সামনে নির্বাচন থাকায় পুলিশের মধ্যে নতুন করে কোনো বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটলে বাহিনীকে সামনে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেদিন পুলিশ কোনো অ্যাকশন নেয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে। গুলি চালানো পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ সেখানে চার-পাঁচ হাজার মানুষ ছিল এবং পুলিশের জনবল ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
কারওয়ান বাজারে পুলিশ কখন পৌঁছায়—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ঘটনার আগেই পুলিশ সেখানে পৌঁছেছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। তবে পরিস্থিতির কারণে কার্যকর অ্যাকশন নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও জানান, কাঁদুনে গ্যাস বা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মতো পরিস্থিতিও সেখানে ছিল না।
এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে পুলিশ কী করবে—এ প্রশ্নে নজরুল ইসলাম বলেন, আগাম তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীও মাঠে রয়েছে।
হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দেওয়া পরিচিত মুখদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, একটি মামলায় একাধিক আইন যুক্ত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও কোনো সংবাদমাধ্যমে হামলার আশঙ্কা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত এমন কোনো তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তবে তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ছায়ানটের ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় এবং উদীচীর ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। বিষয়গুলো পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, ১৮ ডিসেম্বর রাতে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর এলে শাহবাগ অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে একদল লোক কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। একই রাতে ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে এবং পরদিন ১৯ ডিসেম্বর উদীচীর কার্যালয়েও হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।