ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী ডামাডোল ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় নির্ধারিত রয়েছে। এ সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো জোট গঠন, আসন সমঝোতা ও নির্বাচনী কৌশল চূড়ান্ত করতে তৎপরতা বাড়িয়েছে। শেষ মুহূর্তে এসে দেশের রাজনীতিতে একাধিক সমীকরণও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বহুল আলোচিত জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, দু-এক দিনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। গতকাল শুক্রবার রাতেও জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা আসন সমঝোতা নিয়ে রুদ্ধদ্বার দীর্ঘ বৈঠক করেন।
এনসিপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা অরণ্য নিউজকে নিশ্চিত করেছেন, জামায়াত-এনসিপির আসন সমঝোতা এখন কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই এ ঘোষণা আসবে। এমনকি আজ শনিবার অথবা আগামীকাল রোববারই ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
এনসিপি নেতাদের ভাষ্য, এটি মূলত একটি নির্বাচনী কৌশলগত সিদ্ধান্ত। সংস্কার প্রশ্নে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। দলের নির্বাহী কমিটির অধিকাংশ সদস্য এবং শীর্ষ নেতৃত্ব সম্মিলিতভাবে এই সমঝোতায় একমত হয়েছেন। যদিও নারী নেত্রীদের কয়েকজনসহ দলের একাংশ শুরুতে আপত্তি জানিয়েছিলেন, তবে দলের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় তাদের অনেকেই পরে সম্মতি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির বলেন, “আগামী রবি ও সোমবারের মধ্যেই আসন সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে ইনশাআল্লাহ। কে কোন আসন থেকে নির্বাচন করবেন, সেটিও খুব দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপি বাদে জুলাইয়ের শক্তিগুলো—বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোট এক হলে আমরা একটি শক্ত অবস্থানে যেতে পারব। আমাদের লক্ষ্য সরকার গঠন।”
এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানান, আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে দলটি অন্তত ৫০টি আসনের নিশ্চয়তা চাইছে। যদিও বাস্তব আলোচনায় ৩০টি আসন দেওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। দলের অভ্যন্তরে এ নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে এবং প্রায় সব শীর্ষ নেতাই এই সমঝোতার অংশ হচ্ছেন।
এনসিপির নির্বাহী কমিটির এক সদস্য অরণ্য নিউজকে বলেন, “সংস্কার ও দলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই জোট বা আসন সমঝোতা হচ্ছে। নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশ সংস্কার করাই মূল উদ্দেশ্য। যারা আগে বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন দলীয় স্বার্থে একমত হয়েছেন।”
তিনি আরও জানান, জোট যদি রাজনৈতিক রূপ নেয়, সে ক্ষেত্রে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জোটের মুখপাত্র হতে পারেন।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ইতোমধ্যে ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও তিনি এখনো কোন দল বা জোট থেকে নির্বাচন করবেন, তা চূড়ান্তভাবে জানাননি। তবে এনসিপির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, আগামী ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই আসিফ মাহমুদ এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন এবং সমঝোতার খসড়া তালিকায় তার নাম রয়েছে।
এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ অরণ্য নিউজকে বলেন, দলভুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা থাকলেও তিনি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে ঢাকা-১০ আসন থেকেই নির্বাচন করবেন বলে জানান।
অরণ্য নিউজের হাতে আসা খসড়া তালিকা অনুযায়ী, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১, সদস্য সচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লা-৪, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-১৮সহ একাধিক নেতা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। অন্যান্য আসন নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে।
এদিকে বিএনপিও তার শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা সম্পন্ন করেছে। কারা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন এবং কোন কোন আসন শরিকদের জন্য ছাড়া হবে—তা প্রায় চূড়ান্ত। এনসিপির সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হলেও তা আর এগোয়নি।
এমন বাস্তবতায় জামায়াত-এনসিপির জোট গঠনের তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকেই এ বিষয়ে আলোচনা প্রকাশ্যে আসে। সেদিন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এনসিপির প্রতিনিধি দল দুই দফা বৈঠক করে। বৈঠকে সংস্কার, বিচারসহ একাধিক মৌলিক ইস্যুতে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ৩০টি আসন দেওয়ার প্রাথমিক আলোচনা করেছে, যদিও এনসিপির চাহিদা অন্তত ৫০টি আসন। এসব আসনে এনসিপির জোটসঙ্গী আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের থাকা না থাকার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “আলোচনা এখনো চলছে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে দু-এক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।”
জামায়াতের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, দলটি দেড়শ থেকে দুইশ আসনে নিজস্ব প্রার্থী দেবে। জোট চূড়ান্ত হলে বাকি আসনগুলো এনসিপি, এবি পার্টি ও অন্যান্য মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান বলেন, “৮ দলীয় জোটের বাইরে নতুন শক্তির সংযোজন হচ্ছে। এনসিপিসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। আগামী ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই সব চূড়ান্ত হবে।”
এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একাধিকবার জানিয়েছিলেন, দলটি এককভাবে নির্বাচন করবে। সে লক্ষ্যেই প্রথম ধাপে ১২৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয় এবং দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। তবে তিনি এটাও বলেছিলেন, জুলাই সনদ ও সংস্কারের দাবিতে ঐক্যমত হলে রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
জোট বা আসন সমঝোতা হলেও এনসিপি নিজস্ব প্রতীক ‘শাপলা কলি’ নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবে। সম্প্রতি আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এ কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।