মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান—দীর্ঘ সামরিক জীবনে যিনি একাধিক রাষ্ট্রীয় ও পেশাগত পুরস্কারে ভূষিত, এমনকি স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত। তবে সেই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের বিপরীতে বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ। একাধিক মামলায় কারাবন্দী জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম ও হত্যার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ বা প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিচার শুরুর অপেক্ষা চলছে। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে গুম, খুন ও দমন-পীড়নের অন্যতম পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে জিয়াউল আহসানের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসব অপরাধে তাঁর ভূমিকা ছিল সংগঠিত ও বহুমাত্রিক। দায়িত্ব পালনকালে তিনি ছিলেন বেপরোয়া ও প্রভাবশালী।
প্রসিকিউশন আরও দাবি করেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দক্ষতা এবং সরকারের প্রতি আনুগত্যের কারণেই তাঁকে একের পর এক পুরস্কৃত করা হয়। এমনকি সেনাবাহিনীর নিয়মিত কাঠামোর বাইরে রেখেও তাঁকে পদোন্নতির সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তাঁদের মতে, পেশাগত সততা ও শৃঙ্খলার কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সম্মাননা পেয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি হয় ৪ জানুয়ারি এবং আসামিপক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ৮ জানুয়ারি।
এ মামলায় জিয়াউল আহসান একমাত্র আসামি। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ১৭ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
প্রথম অভিযোগটি ২০১১ সালের ১১ জুলাই গাজীপুরের পুবাইলে সড়কের পাশে সজলসহ চারজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। দ্বিতীয় অভিযোগটি ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী এলাকায় বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও আলকাছ মল্লিকসহ ৫০ জনকে গুম ও হত্যার অভিযোগ। তৃতীয় অভিযোগে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ও এডিজি (অপস্) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে ১০৪ জনকে গুম করার প্রমাণ পাওয়ার দাবি তুলে অভিযোগ গঠনের আবেদন জানায় প্রসিকিউশন।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জিয়াউল আহসান সরাসরি বা অধস্তনদের মাধ্যমে এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের বলেশ্বর নদীতে নিয়ে চলন্ত বোটে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এ সংক্রান্ত প্রত্যক্ষদর্শী ও অধস্তন কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন দাবি করে জিয়াউল আহসানের অব্যাহতি চেয়েছেন। তাঁদের মতে, অভিযোগে উত্থাপিত ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি।
সব পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন। ওই দিনই নির্ধারিত হবে—জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হবে কি না।