টানা কয়েক দিনের অস্থিরতা ও সহিংসতার পর ইরানে পরিস্থিতি আপাতত অনেকটাই শান্ত। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের মাত্রা কমেছে, পাশাপাশি সরকারের পক্ষে বড় আকারের সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই আপাত শান্ত পরিবেশের আড়ালেই রয়ে গেছে গভীর অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক।
বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারের নামে সরকার আরও কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও জোরালো হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতের পর সহিংসতা বাড়লেও বর্তমানে সেই পরিস্থিতির তীব্রতা অনেকটাই কমেছে। সোমবার সরকারের পক্ষে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। দেশটির নেতৃত্ব এই জমায়েতকে নিজেদের জন্য ‘সবুজ সংকেত’ হিসেবে দেখছে এবং এর ভিত্তিতেই তথাকথিত ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর’ বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কড়াকড়ি করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অস্ত্রধারী কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির ভিডিও ও ছবি প্রচার করা হয়েছে, যেখানে তাদের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলাগুলোই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।
তবে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। ট্রাম্পের হুমকির পর স্থানীয়দের মধ্যে ভয়, হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিক্ষোভ কমেছে, আতঙ্ক যায়নি
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভ বা দাঙ্গা দেখা যায়নি। তার মতে, পরিস্থিতি এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি মূলত নিরাপত্তাজনিত সিদ্ধান্ত। গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইরানের অবকাঠামো ব্যবহার করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, এবারও একই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইজাদি আরও দাবি করেন, বিক্ষোভের সময় কিছু দাঙ্গাবাজ পুলিশ সদস্য ও দোকানদারদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। যারা দোকান বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ নিহত হয়েছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল থেকে সরকারপন্থি সমাবেশ ও মিছিলের সংখ্যা বাড়ছে, বিপরীতে সরকারবিরোধী কর্মসূচি কমে যাচ্ছে। বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, সহিংসতায় নিহত শতাধিক ব্যক্তির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকও রয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কার কথা বলা হলেও ইরানের কোনো সরকারি সূত্র এখনো তা নিশ্চিত করেনি। দেশটির আইনে কাউকে যদি ‘মোহারেবেহ’—অর্থাৎ ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক ফোনালাপ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ‘যেকোনো পরিস্থিতি’ মোকাবিলার জন্য ইরান প্রস্তুত। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়ের তুলনায় এখন ইরানের সক্ষমতা গুণগত ও পরিমাণগত—দুই দিক থেকেই আরও শক্তিশালী।