চমকানো তথ্য দিলেন রাষ্ট্রপতি
দীর্ঘ দেড় বছর কার্যত আড়ালে থাকা এক রাষ্ট্রপতির রুদ্ধশ্বাস সময়ের বিবরণ উঠে এলো বঙ্গভবন থেকে। টানা দেড় বছরের ‘প্রাসাদবন্দি’ জীবনের অবসান ঘটার পর সেই অভিজ্ঞতা, চাপ, ষড়যন্ত্র ও প্রতিরোধের গল্প প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আনলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকার নেন কালের কণ্ঠ-এর নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই নিজের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি স্বস্তিতে আছেন। তবে এর আগে সময়টা ভালো কাটেনি-এমন ইঙ্গিত দিয়ে রহস্যময় হাসিতে তিনি প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বঙ্গভবনে কাটানো দেড় বছর সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই সময় তিনি কোনো আলোচনায় ছিলেন না, অথচ তাঁকে ঘিরে চলেছে নানা চক্রান্ত। তাঁর ভাষায়, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট ও সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির জন্য একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে দৃঢ় অবস্থানে থাকার কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, অসাংবিধানিকভাবে তাঁকে অপসারণের বহু ছক আঁকা হলেও তিনি সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন। সে কারণে দেড় বছরের অভিজ্ঞতাকে সুখকর বলা যাবে না। তাঁর ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, তা সহ্য করার সক্ষমতা অন্য কারো ছিল কি না-সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বঙ্গভবন ঘিরে বিক্ষোভ, মিছিল ও পদত্যাগ দাবির প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁকে উপড়ে ফেলার নানা চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তিনি ভাঙেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রয়োজনে বঙ্গভবনে তাঁর রক্ত ঝরবে, তবু তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন।
২২ অক্টোবর ২০২৪-এর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের বর্ণনায় রাষ্ট্রপতি বলেন, রাতারাতি বিভিন্ন নাম ও ব্যানারে সংগঠিত লোকজন জড়ো হয়। তাদের অর্থের উৎস নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের সদস্যরা তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তিনি আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে ‘ভাড়াটিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে একাধিক ঘটনার বর্ণনা দেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ওই রাতটি ছিল তাঁর জন্য বিভীষিকাময়। চারদিক থেকে ছিন্নমূল লোকজন এনে বঙ্গভবন লুটের চেষ্টা হয়েছিল। তবে তিন স্তরের নিরাপত্তা ও সেনাবাহিনীর দৃঢ় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সেই সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক সহায়তার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর পাশে ছিলেন। সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্নে তারা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে নিজের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির দাবি, গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাঁকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের অবস্থানের কারণে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।
তিনি আরও জানান, রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানোর চেষ্টা করেছিল। তবে ওই বিচারপতি রাজি না হওয়ায় সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়।
নিজের মনোবলের পেছনে রাজনৈতিক আশ্বাস ও তিন বাহিনীর সমর্থনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁকে জানানো হয়েছিল-রাষ্ট্রপতির পরাজয় মানে সশস্ত্র বাহিনীর পরাজয়। সেই অবস্থান থেকেই বাহিনী প্রধানরা তাঁর পাশে ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেড় বছরে তাঁর সঙ্গে কোনো সমন্বয় হয়নি। একাধিকবার বিদেশ সফর, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়েও তাঁকে অবহিত করা হয়নি, যা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন, তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। বিদেশ সফর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনসহ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলো থেকে রাতারাতি তাঁর ছবি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকেও তিনি অপসারণের একটি ধাপ হিসেবে দেখেন।
বঙ্গভবনের প্রেস উইং কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের ঘটনায় প্রেস উইংয়ের তিন কর্মকর্তাসহ ফটোগ্রাফারদের প্রত্যাহার করা হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, জাতীয় দিবসগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির বাণী প্রকাশ বন্ধ রাখা হয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছরে তাঁর কোনো বাণী প্রকাশিত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন একুশে ফেব্রুয়ারিতে হয়তো তাঁর বাণী প্রকাশ পাবে।