জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এ সফরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৯টায় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর আগে রোববার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাপানের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি।
২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এ সফরে প্রধানমন্ত্রী জাপানের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি দেশটির শিল্পকারখানা ও জ্বালানি অবকাঠামো পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে।
১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা রয়েছেন।
প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এ ছাড়া রয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মুস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী, অর্থনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী এবং আমজনতার পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর করার মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো সফরের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও আলোচনা হবে।
সফরকালে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি দক্ষতা, বেসামরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল রূপান্তর নিয়েও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
জাপানের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়
প্রধানমন্ত্রী সফরকালে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
জাপানের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাঁর মতবিনিময়ের কর্মসূচি রয়েছে। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়ার টয়োটা কারখানা পরিদর্শনেরও কর্মসূচি রয়েছে। এসব পরিদর্শনের মাধ্যমে জাপানের আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রত্যাশা
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ভূমিকা পালন করে আসছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে দেশটির সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র উন্মোচিত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।