প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমতি দিলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তার এমন বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বৈধতা, পুলিশের ক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সোমবার রাজধানীর চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেটা করব।’
পুলিশের কাজের পরিবেশ ও ক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ লাঠিপেটা করলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’ বলা হয়, আর নীরব থাকলে বলা হয় দুর্বল পুলিশ। দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে ক্ষমতায়িত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
তবে সরকারের অনুমতি থাকলেই কি কাউকে গুলি করে হত্যার বৈধতা তৈরি হয়? অপরাধ দমনে পুলিশের হাতে কী ধরনের ক্ষমতা রয়েছে, আর সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়?
ক্রসফায়ার কী, আইনে কী আছে?
ক্রসফায়ারের আক্ষরিক অর্থ দুইপক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়। তবে বাংলাদেশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দটির প্রচলিত অর্থ বদলেছে। এখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রায়ই ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘গুলিবিনিময়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে কাউকে ‘ক্রসফায়ার করা’ বলতে সাধারণত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকেই বোঝানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত বর্ণনায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার বা অন্য অভিযানে যাওয়ার সময় তার সহযোগীরা গুলি চালান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাল্টা গুলি চালালে ওই ব্যক্তি নিহত হন।
তবে এসব ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিকে হত্যা করে ঘটনাটি বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান বা প্রচলিত আইনে ‘ক্রসফায়ার’ নামে কাউকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার স্বতন্ত্র কোনো অনুমতি নেই। দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায় আত্মরক্ষার অধিকার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য বল প্রয়োগ, এমনকি প্রাণঘাতী বল প্রয়োগও আইনসিদ্ধ হতে পারে। তবে এই অধিকার সীমাহীন নয়।
বিশেষজ্ঞদের মত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের বক্তব্য ও চিন্তা অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্রসফায়ারকে সন্ত্রাস দমন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে তুলে ধরা হলেও এটি আসলে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড’ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কাউকে কোনো খেতাব বা অভিযোগ দিয়ে, বিচারের ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করে হত্যা করাই ক্রসফায়ারের বাস্তবতা। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থেকেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
তার মতে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে একই ধরনের চিন্তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আইজিপি যখন বলেন, সরকার অনুমতি দিলে বা প্রয়োজন হলে ক্রসফায়ার করা হবে, তখন বোঝা যায়, তার চিন্তার মধ্যেও এই পদ্ধতি রয়ে গেছে।
এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে পুলিশকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের ভয় দেখানো ও ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, পুলিশের এই ভাষা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাষার সঙ্গে মেলে। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও এ ধরনের চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না এবং আইজিপির এই বক্তব্য প্রত্যাহার করা উচিত বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।
সংবিধানবিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরিফ খান আইজিপির এমন বক্তব্য ‘সংবিধান ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ বলে মনে করেন।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, পুলিশকে অস্ত্র দেওয়া হয় নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আত্মরক্ষা বা অন্যের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করতে পারেন। তবে এর নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বা বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে হত্যার সুযোগ নেই।
সংবিধানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আর ৩৫ অনুচ্ছেদে রয়েছে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। এমনকি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
তার মতে, আইজিপির বক্তব্য সরকারকেও একটি নীতিগত অবস্থানের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার বক্তব্যের সূত্র ধরে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমতি দিয়েছে বলে মনে করার সুযোগ তৈরি হবে।
অতীত অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করা হয় পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে। এরপর থেকে নানা সময়ে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে।
ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুন। ওই ঘটনায় র্যাবের সদস্যদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৭ সালে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর কথিত বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ওই বছর পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৪৬৬ জন।
টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় র্যাবের গুলিতে নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাটিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও পরিবারের প্রকাশ করা অডিও রেকর্ডিং নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। পরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও তার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানায়।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। তার পরিবারের করা হত্যা মামলায় ২০২২ সালে টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। ২০২৫ সালের জুনে হাইকোর্টও তাদের সাজা বহাল রাখেন।
মামলাটি দেখিয়েছে, পুলিশের অভিযানে কারও মৃত্যু হলেই বাহিনীর দেওয়া বর্ণনাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যায় না। ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে র্যাব ও বাহিনীটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে ছাত্রদের আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানি, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগও বাহিনীটির জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আনে। ওই সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহল বাহিনীটির বিলুপ্তি বা সংস্কারের সুপারিশ করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। তাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর র্যাব বিলুপ্ত করে এর জায়গায় পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন কার্যকর হয়।
আইনজীবী আরিফ খান বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনায় বাহিনীটির জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশপ্রধান হিসেবে আইজিপির এমন বক্তব্য পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
সৌজন্যে : ডেইলি স্টার