উচ্চ বেতনে চাকরি, উন্নত জীবনযাপন ও রুশ নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে তাঁদের অনেককে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় মানবপাচার ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে উপস্থাপিত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৪৮টি দেশের নাগরিকদের পরিস্থিতি তদন্ত করে ২৯টি দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক বা জোরপূর্বক নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, কেনিয়া, নাইজেরিয়া ও উজবেকিস্তান রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতারণার শিকার অনেক বিদেশি নাগরিক রাশিয়ায় যাওয়ার পর নিহত, আহত, বন্দি কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের পরিবারের অনেকেই স্বজনদের প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না। এমনকি নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতেও পরিবারগুলোকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
জাতিসংঘ কমিশন ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া ২৪৫টি সাক্ষ্য এবং চাকরির আমন্ত্রণপত্র, ভিসা, ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিসহ বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। তদন্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসার অনুলিপিও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথিতে রাশিয়ার একটি বেসামরিক কোম্পানির মাধ্যমে তাঁদের সেখানে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বেসামরিক চাকরির বিজ্ঞাপন, গন্তব্য যুদ্ধক্ষেত্র
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ায় নিরাপত্তারক্ষী, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, নির্মাণশ্রমিক ও কারিগরি কর্মী হিসেবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রুশ নাগরিকত্ব, পেনশন, উচ্চ বেতন ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। নিয়োগকারী এজেন্টরা ভিসা, বিমান টিকিট ও আবাসনের ব্যবস্থা করে দিয়ে তাঁদের রাশিয়ায় নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর অনেককে সাময়িক আবাসনকেন্দ্রে রাখা হয় এবং পরে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক বিদেশিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বছরের সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অধিকাংশ বিদেশি নাগরিকের পক্ষে সেগুলোর শর্ত বোঝা কঠিন ছিল। কারও কারও পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। চুক্তিতে সই করতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁদের অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণের সময় ছিল মাত্র ২০ মিনিট থেকে কয়েক দিন; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক মাস। ফলে সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকা অনেক বিদেশি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
কমিশনের নথিভুক্ত একটি ঘটনায় দেখা গেছে, ৩০ জনের একটি দলকে একটি বেসামরিক কোম্পানি লিখিতভাবে আশ্বাস দিয়েছিল যে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হবে না। কিন্তু পরে ওই দলের ১৭ জন নিহত, পাঁচজন নিখোঁজ এবং একজন আহত হন। তবে ওই ৩০ জনের জাতীয়তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তদন্তকারীরা আরও অভিযোগ পেয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকারী এজেন্ট ও সামরিক সদস্যরা নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেতন ও বোনাস আত্মসাৎ করেছেন। এতে প্রতারণার শিকার ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
রাশিয়ায় চাকরির ছাড়পত্র প্রায় আট হাজার
বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে রাশিয়ায় কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া নাগরিকদের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য রাশিয়া ৭ হাজার ৯৪৯টি চাকরির ছাড়পত্র জারি করেছে। তবে এসব ছাড়পত্র পাওয়া ব্যক্তির মধ্যে কতজন বর্তমানে রাশিয়ায় কর্মরত, কতজন সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন কিংবা কতজন নিহত বা নিখোঁজ তার সুনির্দিষ্ট হিসাব জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নেই। চলতি বছরের মার্চে মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটস ও অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ট্রুথ হাউন্ডের যৌথ তদন্তে অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশির রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হওয়ার তথ্য উঠে আসে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর অনেকেই এখনো স্বজনদের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। কেউ মৃত্যুর তথ্য যাচাই করতে, আবার কেউ মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
নির্মাণশ্রমিকের কথা বলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে এ ধরনের একাধিক ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানবপাচার সেলের তদন্তে অভিযোগ ওঠে, ঢাকার ‘ড্রিম হোম ট্রাভেল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ২০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল। তাঁদের মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। পরে তাঁদের কয়েকজনকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে হয় এবং অন্তত তিনজন বাংলাদেশি নিহত হন বলে খবর পাওয়া যায়।
এ ছাড়া গত ১৪ অক্টোবর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, নির্মাণকাজের কথা বলে রাশিয়ায় পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় এবং পরে আরও তিনজন নিহত হন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ওই কর্মীরা গড়ে ১০ লাখ টাকা করে ব্যয় করে গত ৭ মে রাশিয়ায় যান। সেখানে নির্মাণকাজে নিয়োগের পরিবর্তে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণের পর তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের সন্দেহভাজন দুই সদস্যকে গত ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা, অবৈধ নিয়োগ এবং মানবপাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
মানবপাচার হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ জাতিসংঘের
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের মতে, প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনা মানবপাচারের শামিল হতে পারে। এ ধরনের নিয়োগের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে কমিশন। রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে থাকা প্রতারণা ও জবরদস্তির শিকার ব্যক্তিদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে তাঁদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা না করে ভুক্তভোগী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশন বলেছে, প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা যুদ্ধবন্দির মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য হলে তৃতীয় জেনেভা কনভেনশনের অধীনে তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের আটক থাকা কিংবা আত্মসমর্পণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনগত সুরক্ষা দিতে হবে।
এ ছাড়া যেসব দেশের নাগরিক এভাবে রুশ বাহিনীতে নিয়োগের শিকার হয়েছেন, সেসব দেশকে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের মুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের সঙ্গেও সমন্বয় করার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
প্রতারণা ও মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শুধু রুশ বাহিনীতে নিয়োগের কারণে মামলা বা বিচার না করে তাঁদের ভুক্তভোগী হিসেবে বিবেচনা করার সুপারিশও রয়েছে প্রতিবেদনে।
সরকারের করণীয় নিয়ে প্রশ্ন
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন) শরিফুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, রাশিয়ায় কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে নিয়োগের বিষয়ে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। তিনি বলেন, নতুন করে যেন কোনো বাংলাদেশি রাশিয়ায় গিয়ে এভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গত দুই বছরে বৈধভাবে রাশিয়ায় যাওয়া প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশির বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তাঁদের মধ্যে কতজন এখনো রাশিয়ায় কাজ করছেন, কতজন সামরিক বাহিনীতে রয়েছেন এবং কতজন বেঁচে আছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন সে বিষয়ে সরকারকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটন ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়েও অনুসন্ধান চালানো যেতে পারে। রাশিয়ার দূতাবাসের কাছ থেকে গত কয়েক বছরে কতজন বাংলাদেশিকে ভিসা দেওয়া হয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
শরিফুল ইসলামের মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা জরুরি
বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে চান বাংলাদেশের অনেক মানুষ। উচ্চ বেতন ও উন্নত জীবনের আশায় তাঁরা বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু চাকরির নামে প্রতারণা করে কাউকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হলে তা শুধু তাঁর জীবনকেই বিপন্ন করে না, পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের কার্যক্রম যাচাই, বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের তথ্য হালনাগাদ, নিখোঁজ ও নিহত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির চুক্তির ভাষা, কাজের ধরন, নিয়োগকর্তার পরিচয় ও ভিসার বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়ে কর্মীদের সচেতন করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রতারণা ও জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগের ঝুঁকি কমাতে।