বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সংগীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি ভাষা, মুক্তিসংগ্রাম, জাতীয় পরিচয় ও মানুষের আবেগের এক শক্তিশালী প্রকাশ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সংগীত শেখার ক্ষেত্রে পারিবারিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত ওস্তাদ কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর নির্ভর করতে হতো অনেককে। এই বাস্তবতায় সংগীতকে নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষার আওতায় আনা, সংগীতশিল্পী তৈরির পাশাপাশি সংগীত বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার পথ তৈরি করার যে প্রয়াস, সরকারি সংগীত কলেজ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সরকারি সংগীত কলেজের ইতিহাস তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠার কাহিনি নয়; বরং বাংলাদেশের সংগীতচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার দীর্ঘ প্রচেষ্টারও অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংগীতের প্রতি নিবেদিত শিক্ষক, শিল্পী, সংগঠক, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং নেপথ্যে কাজ করা বহু মানুষের অবদান। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সংগীতশিক্ষাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছে।
মাত্র ৭৫ টাকা থেকে সংগীত কলেজের যাত্রা
সরকারি সংগীত কলেজের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী, সংগীতাচার্য পণ্ডিত বারীণ মজুমদার। ১৯৬৩ সালের ১০ নভেম্বর তাঁর উদ্যোগে ঢাকার কাকরাইলের মনোয়ারা কিন্ডারগার্টেনের কয়েকটি কক্ষে ‘কলেজ অব মিউজিক’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগে তাঁর হাতে ছিল মাত্র ৭৫ টাকা। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সংগীতশিক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই সময়ে সংগীতকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর্যায়ে উন্নীত করা সহজ ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংগীতের জন্য বিশেষায়িত কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। পণ্ডিত বারীণ মজুমদারকে প্রশাসনিক অনুমোদন আদায়, অর্থসংস্থান এবং শিক্ষক সংগ্রহের মতো কঠিন কাজ সামলাতে হয়েছে। তাঁর সঙ্গে এই উদ্যোগে সহযোগিতা করেন এ কে এম মুস্তবা, প্রকৌশলী আবদুল হাই ও হেমায়েত আলীসহ কয়েকজন সংগীত ও সংস্কৃতিপ্রেমী। এই সহযোগীদের অবদান দেখিয়ে দেয়, একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে শুধু একজন স্বপ্নদ্রষ্টা থাকেন না; প্রয়োজন হয় সমমনা মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ, ত্যাগ ও দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।
বারীণ মজুমদারের স্বপ্নে ইলা মজুমদারসহ গুণীজনদের অবদান
পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের জীবনসঙ্গী ইলা মজুমদার ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির শুরুর দিকের শিক্ষকদের একজন। প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকতা ও সংগীতশিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার কাজে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্প পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কলেজটির সঙ্গে যুক্ত হন বহু খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী ও শিক্ষাবিদ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল আহাদ, ওস্তাদ খাদের হোসেন খান, শেখ লুৎফর রহমান, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, শেখ সাদী খান, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, আবিদা সুলতানা, খুরশীদ আলম, তপন মাহমুদ ও ইয়াকুব আলী খানসহ অনেকে। তাঁদের শিক্ষকতা, সংগীতচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৭০ সালে কলেজের উদ্যোগে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে তিন দিনব্যাপী সংগীত সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠানটির সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে। স্বাধীনতার পরও শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা প্রসারে বারীণ মজুমদারের উদ্যোগ অব্যাহত ছিল।
বেসরকারি উদ্যোগ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ১৯৮৪ সালের ১১ মে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। এরপর ‘কলেজ অব মিউজিক’ পরিচিত হয় সরকারি সংগীত কলেজ নামে। আগারগাঁওয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে; ১৯৮৮ সালের বন্যার পর স্থান পরিবর্তনের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কলেজটি নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। সরকারিকরণ ছিল প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে সংগীতশিক্ষাকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হয়। সংগীতের বিভিন্ন ধারায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। উচ্চাঙ্গ সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকসংগীত ও তালযন্ত্রের মতো বিষয়ে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের সংগীতচর্চাকে নতুন ভিত্তি দেয়।
শিল্পী তৈরির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ
সরকারি সংগীত কলেজের গুরুত্ব শুধু সংগীতশিল্পী তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের সুর, তাল, রাগ, সংগীতের ইতিহাস এবং পরিবেশনার শৃঙ্খলা সম্পর্কে জ্ঞান দেয়। সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ, শিক্ষকতা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার পথও তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বহু শিল্পী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি অর্জন করেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি বাংলা গানের বিভিন্ন ধারার শিল্পী তৈরিতে কলেজটির ভূমিকা রয়েছে। এর শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষকদের সংগীত পরিবেশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে সংগীতের ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।
এই অর্থে সরকারি সংগীত কলেজের প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নীরব বিপ্লব। এখানে বিপ্লব বলতে কোনো আকস্মিক পরিবর্তন নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে সংগীতশিক্ষার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত শিল্পী তৈরি এবং সংগীতকে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের মর্যাদা দেওয়ার ধারাবাহিক পরিবর্তনকে বোঝায়।
ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন আধুনিকায়ন। তবে ঐতিহাসিক অবদানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান সীমাবদ্ধতার কথাও বিবেচনায় নিতে হবে। ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর সংগীতশিক্ষা, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং পাঠ্যক্রম উন্নয়নের ঘাটতির কথা উঠে আসে।
বর্তমান বিশ্বে সংগীতশিক্ষা শুধু কণ্ঠসাধনা বা বাদ্যযন্ত্রের অনুশীলনে সীমাবদ্ধ নয়। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিজিটাল রেকর্ডিং, সংগীত প্রযোজনা, চলচ্চিত্রের সংগীত, আর্কাইভ সংরক্ষণ ও কপিরাইট ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত স্টুডিও, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং গবেষণার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা পণ্ডিত বারীণ মজুমদার এবং তাঁর সহযাত্রীদের অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁদের জীবন, কর্ম ও প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, স্মারক প্রকাশনা, তথ্যচিত্র এবং সংগীত উৎসব আয়োজন করলে নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবে।
মাত্র ৭৫ টাকার প্রাথমিক উদ্যোগ থেকে শুরু হয়ে সরকারি সংগীত কলেজ আজ বাংলাদেশের সংগীতশিক্ষার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। এর পেছনে রয়েছে পণ্ডিত বারীণ মজুমদারের দূরদর্শিতা, ইলা মজুমদারের মতো প্রাথমিক শিক্ষকদের অবদান এবং বহু শিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠকের সম্মিলিত শ্রম।
এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সব সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে ঘটে না। অনেক সময় নেপথ্যে থাকা কিছু মানুষের নিষ্ঠা ও স্বপ্নই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করে। সরকারি সংগীত কলেজের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ সেই নীরব পরিবর্তনেরই এক তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ।
আজ প্রয়োজন এই ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করা নয়, বরং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, গবেষণা ও মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা। তবেই প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরও বিস্তৃত হবে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড