রাশিয়া থেকে আমদানি করা ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা নতুন পারমাণবিক জ্বালানির চতুর্থ চালান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৭টা ১৭ মিনিটে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় তিনটি লরিতে করে ইউরেনিয়ামবাহী চালানটি পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। এ সময় প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ার নাগরিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জ্বালানিবাহী গাড়িবহরকে স্বাগত জানান। পুরো পথে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল। শুক্রবার রাতে রাশিয়া থেকে উড়োজাহাজে ভারতের দিল্লি হয়ে চালানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জ্বালানি গ্রহণ করেন। পরে রাত ১টা ৫৬ মিনিটে বিশেষ নিরাপত্তায় গাড়িবহরটি রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি সাতটি চালানে দেশে আসার কথা রয়েছে। শনিবার পৌঁছানো চালানটি ছিল এর চতুর্থ চালান। অন্যদিকে প্রথম ইউনিটের জ্বালানি পুনঃসংযোজনের জন্য আরও ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি দুটি চালানে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া থেকে আরও সাতটি চালানে জ্বালানি আসার কথা রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটম জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশাদুর রহমান আসাদ জানান, ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে পাবনা জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। যানজট এড়াতে সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পাবনা-নাটোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কে ছোট-বড় যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। চালান পৌঁছানোর পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হয়েছে। পারমাণবিক চুল্লিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন প্রতিষ্ঠার পর চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এরপর আরও পরীক্ষা সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ডিসেম্বরের মধ্যে রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সময় নির্ভর করবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ভৌত পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা শেষে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্ট-আপ বা সি-স্টেজের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দেয় বায়েরা। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও অন্যান্য আর্থিক কারণে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে। বর্তমানে এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।