পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের জীবন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তার ছেলে সুলাইমান খান। কারাগারে বাবাকে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং তাকে হত্যার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে দায়ী করেছেন সুলাইমান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সুলাইমানের দাবি, গত আগস্টের পর থেকে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা ইমরান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এমনকি এরপর থেকে কেউ তার বাবাকে দেখেননি বা তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সুলাইমান বলেন, গত আগস্টে ইমরান খান নিজেই জানিয়েছিলেন, কারাগারে তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির মতো পরিণতির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সুলাইমানের ভাষ্য, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ২০১৯ সালে আদালতে শুনানি চলাকালে মারা যান। ইমরান খানও আশঙ্কা করেছিলেন, তার পরিণতি একই রকম হতে পারে।
সুলাইমান আরও বলেন, ইমরান খানকে হত্যার চেষ্টা চলছে বলে তাদের আশঙ্কা। তিনি এখনো পাকিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা এবং শাসকগোষ্ঠী তাকে ভয় পায় বলেও মন্তব্য করেন সুলাইমান। তার ভাষায়, বাবার কোনো ক্ষতি হলে এর দায় কার, তা নিয়ে যেন কোনো সংশয় না থাকে। ইমরান খানের চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে তার পরিবার। সুলাইমানের অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করছেন।তার দাবি, গত আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য তাকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও তাকে একাকী বন্দি করে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান সরকার। আগস্টে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া লিখিত জবাবে দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ইমরান খান সরকারের কোনো নির্বাহী আদেশে আটক নন। বরং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেওয়া সাজা ভোগ করছেন একজন দণ্ডিত বন্দি হিসেবে।৭৪ বছর বয়সী ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি। দুর্নীতি ও ঘুষসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইমরান খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন। বাবার মুক্তির দাবিতে প্রচার চালাতে গিয়ে ইমরান খানের পরিবারের সদস্যরাও চাপের মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সুলাইমান ও তার ভাই কাসিম খানকে এ বিষয়ে প্রচার চালানোর জন্য পাকিস্তান সফর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নরিন নিয়াজিকে আটক করা হয়। পাঞ্জাব প্রদেশের জনশৃঙ্খলা রক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় পরিকল্পিত বিক্ষোভের আগে তাদের আটক করা হয়েছিল। সোমবার প্রাদেশিক সরকারের কর্মকর্তারা তাদের আটকাদেশ আরও ৩০ দিন বাড়ানোর কথা জানান। এদিকে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে আয়োজিত এক সমাবেশে হাজারো সমর্থক অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদের দিকে দীর্ঘ পদযাত্রা করেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল ইমরানের মুক্তি, কারাগারে সাক্ষাতের সুযোগ বাড়ানো এবং পছন্দের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে গত ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এ প্রদেশে ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে পিটিআই এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে একে জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা বলে অভিহিত করেছে। দলটির অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন দুর্বল করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে তার জীবননাশের আশঙ্কা এবং সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখন পর্যন্ত সুলাইমান খানের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকাশিত হয়েছে; পাকিস্তান সরকার কারাগারে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।