কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ বসানোর সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে নতুন সম্ভাবনার কথা ভাবছেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা। তাঁদের প্রাথমিক ধারণা, সেখানে অগভীর গ্যাসের আধার থাকতে পারে। এমনকি ভূগর্ভে জ্বালানি তেল বা অন্য কোনো হাইড্রোকার্বন উপজাত থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও পর্যবেক্ষণ ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ প্রয়োজন। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে ছোট ইনানীতে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির উঠানে নলকূপ খননের স্থানে জ্বলতে থাকা গ্যাসের শিখা পরিদর্শন করে এ প্রাথমিক ধারণার কথা জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত ২৭ অক্টোবর সকালে ওই বাড়ির উঠানে নলকূপ বসানোর জন্য খননকাজ শুরু হলে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে সেখানে অনবরত আগুন জ্বলছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মোহাম্মদ শোয়েব জানান, এ ঘটনা নিয়ে গত ২৯ অক্টোবর পেট্রোবাংলায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপককে নিয়ে বৈঠক হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বৈঠকে প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, নির্গত গ্যাসটি বায়োজেনিক উৎসের নয়; বরং থার্মোজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, সেখানে অগভীর গ্যাসের একটি আধার রয়েছে, যেখান থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুনের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে ইনানীতে নির্গত গ্যাসের প্রকৃত উৎস, পরিমাণ কিংবা কোনো স্থানে গ্যাসের লিকেজ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় গ্যাসের প্রবাহ ও আগুনের শিখার উচ্চতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পর্যবেক্ষণ শেষে আগুনের শিখার উচ্চতা বাড়তে থাকলে বা অপরিবর্তিত থাকলে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে প্রাথমিকভাবে একটি ‘রিলিফ ওয়েল’ বা সহায়ক কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ প্রযুক্তি ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, আশপাশের কয়েকটি এলাকাতেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূতাত্ত্বিক গঠনের পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের গ্যাস নির্গমন ঘটে থাকতে পারে।
গ্যাসের মজুদ জানতে থ্রিডি জরিপ
ইনানী এলাকায় গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ অনুসন্ধানে পরবর্তী সময়ে ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি জরিপ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বাপেক্সের। জরিপে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুদের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে সেখানে নতুন কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুক্তাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা বাপেক্সের রয়েছে। নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তবে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০০ মিটার এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ
একটি বাড়ির উঠানে টানা কয়েক দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পাশাপাশি সম্ভাব্য গ্যাসের মজুদ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আগুনের উৎসের চারপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের স্বাক্ষরিত আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। আদেশে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেশলাই বা লাইটার ব্যবহার এবং স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং লাল নিশান টাঙানো হয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থা নেওয়ার পরও ঘটনাস্থলের কাছে উৎসুক মানুষের ভিড় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। টানা কয়েক দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় ছোট খাল এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাসের আধারের সন্ধান, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস নির্গমন ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি দুই বিষয়ই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।