যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন ভোটাররা। নির্বাচনের ফল সরাসরি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদে প্রভাব না ফেললেও তার নীতি বাস্তবায়ন, বাজেট ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশ বা যুক্তরাজ্যের মতো নয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং কংগ্রেসের নির্বাচন আলাদাভাবে অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের দুটি কক্ষ হলো প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেট। কোনো দলের কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মানেই সেই দলের নেতা প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন—এমন নয়। প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট চার বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। কংগ্রেসে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন না।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে গেলে প্রেসিডেন্টের আইন পাস, বাজেট অনুমোদন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা
আগামী ৩ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতে নির্বাচন হবে। নির্বাচনের আগে জনমত পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও ঐতিহাসিক প্রবণতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের জন্য আশার কারণ হতে পারে। গত একশ বছরে মাত্র তিনটি মধ্যবর্তী নির্বাচন ছাড়া বাকি সব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি ব্যবধানে না থাকায় ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে সিনেটের নির্বাচনী সমীকরণ রিপাবলিকানদের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। জিনিসপত্র ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষও ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বাজেট ও করনীতিতে বাধা
কংগ্রেস বিভক্ত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না। বিশেষ করে সরকারি ব্যয় বাড়ানো, কর কমানো কিংবা বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে পারে প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রে বড় বাজেট ও আর্থিক আইন পাসের ক্ষেত্রে ‘বাজেট রিকনসিলিয়েশন’ বা বাজেট সমন্বয়ের বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। এ পদ্ধতিতে সিনেটে সাধারণ ৬০ ভোটের পরিবর্তে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট আর্থিক বিল পাস করা সম্ভব। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ এ পদ্ধতিতে পাস হয়েছিল। তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে নতুন আর্থিক পরিকল্পনা অনুমোদন করানো কঠিন হতে পারে। করপোরেট কর কমানো, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো কিংবা সামাজিক খাতের ব্যয় কমানোর মতো প্রস্তাব বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নতুন সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। পাশাপাশি করনীতির পরিবর্তন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাড়তে পারে নির্বাহী আদেশের ব্যবহার
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে গেলে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। আইন প্রণয়নের পথ কঠিন হয়ে উঠলে প্রশাসন বিদ্যমান আইনের আওতায় থাকা নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য, শুল্ক ও অভিবাসন নীতিতে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে শুল্ক আরোপসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা ব্যবহারের নজির দেখিয়েছে। তবে নির্বাহী আদেশও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং আদালতের পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে। পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। ফলে কংগ্রেসে বিরোধী দলের প্রাধান্য থাকলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা নিরাপত্তা নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে না।
ঋণ ও বাজেট ঘাটতির চাপ
মার্কিন অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি। ২০২৫ সালের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণসীমা ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে ৪১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সরকারের ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন ঋণসীমাও অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে বলে সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজের হিসাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ঋণসীমা বাড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে সরকারি বন্ড ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের নজর অর্থনীতির মৌলিক সূচকে
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শেয়ারবাজারে সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গতিপথ নির্ধারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং কোম্পানিগুলোর আয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকানরা সাধারণত কর কমানো, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তায় ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা করপোরেশন ও উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়ানোর নীতিকে গুরুত্ব দেয়। এই নীতিগত পার্থক্য বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের জয়ই শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উত্থান বা পতন নিশ্চিত করে না। কোম্পানির বিক্রি, মুনাফা, উদ্ভাবন ও ব্যবস্থাপনাই শেষ পর্যন্ত তাদের বাজারমূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে আইন প্রণয়ন ও বাজেট অনুমোদনে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মৌলিক সূচকগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।