শাহিন মন্ডল কথা দিয়েছিলেন, ১২ আগস্ট মায়ের জন্য টাকা পাঠাবেন। সেই টাকা দিয়ে মা নিজের পছন্দমতো ফল কিনে খাবেন। পাশাপাশি সৌদি আরবে যেতে নেওয়া সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করবেন। কিন্তু মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। টাকা পাঠানোর মাত্র তিন দিন আগে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারান ৩২ বছর বয়সী এই প্রবাসী। প্রায় তিন মাস পর শনিবার দেশে ফিরেছে শাহিনের মরদেহ। সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ। তাদের একজন শাহিন।
নওগাঁ সদর উপজেলার পার নওগাঁ গ্রামের বাড়িতে তখন ছেলের অপেক্ষায় বসে ছিলেন মা নার্গিস বেগম। হাতে ছেলের পরিচয়পত্র। পাশে পুত্রবধূ, ছয় বছরের নাতি ও আট মাসের নাতনি। স্বজনদের ভিড়ে শোকের ভারে ভেঙে পড়েন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নার্গিস বেগম বলেন, ছেলে ফল কেনার জন্য টাকা পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু আগুনে পুড়ে চলে গেল। এখন তিনি একা, কীভাবে বাঁচবেন—সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে মায়ের মনে। চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি আরব যান শাহিন। এর আগে নওগাঁর উকিলপাড়ায় একটি দোকানে দর্জির কাজ করতেন। সেই আয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় উন্নত জীবনের আশায় ঋণ করে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। শাহিনের খালা নিলুফা ইয়াসমিন জানান, মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারান শাহিন। এরপর অনেক কষ্টে তাকে বড় করেন মা। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আনতেই বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি।
গত ১২ আগস্ট ৩২ হাজার টাকা পাঠানোর কথা ছিল শাহিনের। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধে এবং বাকি টাকা সংসারের খরচে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই টাকা আর পৌঁছায়নি। গত ৯ আগস্ট রিয়াদের ওই অগ্নিকাণ্ডে শাহিনসহ ১৬ বাংলাদেশি প্রাণ হারান। ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় নয়জনের মরদেহ দেশে আসে। ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্তের পর প্রায় তিন মাসের অপেক্ষা শেষে দেশে ফিরল বাকি সাতজনের মরদেহ। শাহিনের মামা আবদুস সালাম পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, উপার্জন শুরু করে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোর আগেই শাহিন চলে গেলেন। এখন পরিবারটি অসহায়। নিহতদের মধ্যে শাহিনসহ পাঁচজন নওগাঁর এবং দুজন নাটোরের বাসিন্দা। তাদের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়। প্রবাসে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঋণ করে যাওয়া এসব মানুষের জীবনে উপার্জনের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। রেখে গেলেন ঋণের বোঝা, অসহায় পরিবার আর অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের জন্য দীর্ঘশ্বাস। শাহিনের মা হয়তো আর কোনো দিন ছেলের পাঠানো টাকায় নিজের পছন্দের ফল কিনে খাবেন না।
রূপক আইচ/ 1 নভেম্বর ২৬