সমুদ্রে মাছ ধরতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার মৎস্য আহরণ বাড়ালেও তা বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক মাছ ধরার ট্রলারে ‘সোনার’ প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে অতিরিক্ত মাছ আহরণ বা ওভারফিশিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক মজুদ, প্রজনন এবং ক্ষুদ্র জেলেদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্যিক মৎস্য ট্রলারে দুই বছরের জন্য সোনার প্রযুক্তির ব্যবহার স্থগিত করেছে সরকার। সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩০ হাজার নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজ সাগরে মাছ আহরণ করে। এসব নৌযানে প্রতি মাসে গড়ে ১০ হাজার টন মাছ ও চিংড়ি আহরণ করা হয়। এর মধ্যে নিবন্ধিত যান্ত্রিক ও আর্টিশনাল মাছ ধরার নৌযান রয়েছে ২৯ হাজার ৬৭৯টি। আর বাণিজ্যিক মাছ ধরার জাহাজের সংখ্যা ২০২টি। সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান মূলত দুই ধরনের। ছোট ও উপকূলীয় এলাকায় মাছ শিকার করা আর্টিশনাল ফিশিং বোট এবং গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণকারী বড় বাণিজ্যিক জাহাজ। নিয়ম অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে বাণিজ্যিক ট্রলারের লাইসেন্স প্রয়োজন। ২০১১ সালে সরকার ৩৪টি ট্রলারকে মাছ ধরার লাইসেন্স দেওয়ার পর এ খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। একসময় থাইল্যান্ড থেকে মাছ ধরার ট্রলার আমদানি করা হলেও বর্তমানে দেশীয় উদ্যোক্তারাই অত্যাধুনিক ফিশিং ট্রলার নির্মাণ করছেন। দেশে এমন ট্রলার নির্মাণে সক্ষম প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১০টি।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৫ হাজার ৬৭৬টি। এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার যান্ত্রিক ট্রলার মাছ আহরণ করছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ট্রলারের সংখ্যা ৪৯টি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েকবার সমুদ্রে গিয়েও অনেক ট্রলার প্রত্যাশিত মাছ পাচ্ছে না। অন্যদিকে, সোনার প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কিছু বাণিজ্যিক জাহাজে মাছের সন্ধান মিলছে তুলনামূলক বেশি। বর্তমানে প্রায় ৭০টি ট্রলারে এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক শক দিয়েও মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে। এতে সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ আহরণের প্রবণতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সোনার প্রযুক্তির প্রভাব নিরূপণ এবং ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক মৎস্য ট্রলারে প্রথম সোনার প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। ওই বছর চারটি ট্রলারে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে আটটি, ২০১৫ সালে দুটি, ২০১৬ সালে ১১টি, ২০১৭ সালে চারটি, ২০১৮ সালে ছয়টি, ২০১৯ সালে সাতটি, ২০২০ সালে ১৬টি এবং ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২১টি বাণিজ্যিক ট্রলারে সোনার ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমার আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। উপকূলীয় এলাকার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। এই বিস্তৃত জলসীমায় রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক ও পেলাজিক মাছ। জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেখানে ইলিশ আহরণ হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছ আহরণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ১৫ হাজার টন।
গত ১ অক্টোবর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য-২ শাখার উপসচিব মোছাম্মৎ রোজিনা পারভীন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সন্তোষজনক মজুদ নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণে নিয়োজিত সব ট্রলারে সোনার প্রযুক্তির ব্যবহার দুই বছরের জন্য স্থগিত থাকবে। তবে বঙ্গোপসাগরের ২০০ মিটারের বেশি গভীর সমুদ্র এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় টুনা ও টুনাজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণকারী নৌযান এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।
যেভাবে কাজ করে সোনার প্রযুক্তি
সাউন্ড নেভিগেশন অ্যান্ড রেঞ্জিংয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ সোনার। পানির নিচে শব্দতরঙ্গ পাঠিয়ে তার প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বস্তু, মাছের অবস্থান ও পানির গভীরতা শনাক্ত করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সোনার মূলত দুই ধরনের প্যাসিভ ও অ্যাকটিভ। প্যাসিভ সোনার পানির নিচে বিভিন্ন শব্দের উৎস শনাক্ত করে। অন্যদিকে অ্যাকটিভ সোনার শব্দতরঙ্গ পাঠিয়ে প্রতিফলিত সংকেতের মাধ্যমে পানির নিচের অবস্থান ও বস্তুর তথ্য সংগ্রহ করে। মাছ ধরা ও জাহাজ পরিচালনায় উন্নত সোনার প্রযুক্তি হিসেবে চির্প (কমপ্রেসড হাই ইনটেনসিটি রেডিয়েটেড পালস) ব্যবহৃত হয়। এ প্রযুক্তির সাহায্যে পানির নিচে মাছের অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে অল্প সময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ শনাক্ত করে আহরণ করা সম্ভব হয়।
জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যেসব উদ্বেগ সামুদ্রিক মৎস্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোনার প্রযুক্তির ব্যবহারে ট্রলারের মাছ আহরণের পরিমাণ বাড়লেও বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক মজুদ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, লক্ষ্যভিত্তিক মাছ শিকারের কারণে প্রজননক্ষম মাছ ও ছোট আকারের জাটকা ব্যাপকভাবে ধরা পড়ছে। এতে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে । এ ছাড়া বড় বাণিজ্যিক ট্রলারের অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে সাধারণ ও ক্ষুদ্র জেলেরা সমুদ্রে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না। এতে তাঁদের জীবন-জীবিকা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। পানির নিচে অতিরিক্ত শব্দতরঙ্গ সৃষ্টির কারণে সামুদ্রিক প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল, আচরণ ও পরিবেশগত ভারসাম্যও বিঘ্নিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সোনারের বেসিক রেঞ্জ সর্বোচ্চ ২ হাজার মিটার, ফ্রিকোয়েন্সি ৫০ থেকে ২০০ কিলোহার্টজ এবং বিম অ্যাঙ্গেল নির্দিষ্ট করে দেওয়া, যাতে ৩৬০ ডিগ্রি স্ক্যান করা না যায়। এ ছাড়া সোনার ব্যবহারকারী সব ট্রলারে ভেসেল মনিটরিং সিস্টেম (ভিএমএস), অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) ও ইলেকট্রনিক চার্ট প্লটার স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক সচল রাখা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রলারভিত্তিক বার্ষিক মোট সহনীয় আহরণ ও মাসিক কোটা নির্ধারণ, অতিরিক্ত মাছ ধরলে বাড়তি ফি আরোপ, নতুন ট্রলারে সোনার সংযোগের লাইসেন্স বন্ধ এবং ৪০ মিটারের কম গভীরতায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (সামুদ্রিক) মো. নজরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, দেশের মোট জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রপ্তানি আয় হচ্ছে। তবে মৎস্য ব্যবস্থাপনায় সোনার প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, সব বাণিজ্যিক মৎস্য ট্রলারে সোনার ব্যবহার দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার সরকারি আদেশ রয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ সভায়ও বিষয়টি মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকির নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পেলে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নজরদারি করা হবে।