বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ১৪ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। তবে দীর্ঘদিনের আলোচিত এই ঘটনায় এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান সাইফকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
সর্বশেষ গত ২৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ইলিয়াস আলী গুমের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত সংস্থাকে আরও তিন মাস সময় দিয়েছেন। আগামী ২৫ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ওই দিন মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছে।
কারাগারে দুই কর্মকর্তা
মামলার আসামি জিয়াউল আহসান র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা। অন্য আসামি উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান সাইফ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা। গত ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাইফুর রহমানের জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে জিয়াউল আহসানকেও এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২৫ অক্টোবরের শুনানিতে সাইফুর রহমান সরাসরি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে জিয়াউল আহসানকে কারাগার থেকে ভার্চুয়ালি শুনানিতে যুক্ত করা হয়। শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইলিয়াস আলীকে গুমের পাশাপাশি আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
২০১২ সালের সেই রহস্যময় রাত
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী। তাঁর সঙ্গে নিখোঁজ হন গাড়িচালক আনসার আলীও। ওই রাতে তাঁদের ব্যবহৃত গাড়িটি মহাখালী এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর থেকে দুজনের আর কোনো সন্ধান মেলেনি। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনায় তাঁর পরিবার উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করলেও দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও ইলিয়াস আলীর নাম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুমের ঘটনাগুলো তদন্তে কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে শনাক্ত করার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে ইলিয়াস আলীর ঘটনাকেও গুরুত্বপূর্ণ গুমের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক সাক্ষী ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের কথিত ভূমিকা নিয়ে সাক্ষ্য দেন বলে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে।
এখন অপেক্ষা তদন্ত প্রতিবেদনের
ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি এবং দুই কর্মকর্তার কারাগারে থাকা মামলাটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাঁকে কোথায় নেওয়া হয়েছিল এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। আগামী ২৫ জানুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ থাকায় ওই সময়সীমার দিকে এখন নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং ট্রাইব্যুনালে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তার ওপর নির্ভর করছে দীর্ঘদিনের এই রহস্যের বিচারিক অগ্রগতি। তবে ইলিয়াস আলী ও তাঁর গাড়িচালক আনসার আলীর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের পরিবারের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। তাঁদের ফিরে পাওয়ার দাবি এবং ঘটনার সত্য উদ্ঘাটনের প্রত্যাশা এখনো রয়ে গেছে।
রূপক/ ৭ নভেম্বর ২৬