ভোর হওয়ার আগেই রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভিড় জমাতে শুরু করেন দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা। এদের কেউ হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি, কেউবা তীব্র শ্বাসকষ্টে ছটফট করছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি এই হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রে একদিকে যেমন প্রতিনিয়ত চলে জীবন বাঁচানোর নিরন্তর লড়াই, অন্যদিকে সেই লড়াইয়ের আড়ালে প্রতিদিনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে শয্যাসংকট, জনবল ঘাটতি, অচল যন্ত্রপাতি ও প্রশাসনিক জটিলতার নানা চিত্র। জটিল হৃদরোগ, এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, পেসমেকার স্থাপন ও হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের জন্য প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে রোগীরা এই হাসপাতালে আসেন। কিন্তু ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।
গত কয়েক দিন হাসপাতালটি ঘুরে দেখা যায়, হৃদরোগের জটিল চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকে মেঝেতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা এক হাজার ৪০০ হলেও গড়ে প্রতিদিন এখানে চিকিৎসাধীন থাকছেন দুই হাজার রোগী। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই অতিরিক্ত ৭০০-৮০০ রোগীর জন্য বাড়তি জনবল না থাকায় সেবার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে।’ এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিশেষায়িত হৃদরোগ চিকিৎসাকে দেশের অন্যান্য পুরনো মেডিকেল কলেজ ও বিভাগীয় শহরগুলোতে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন তিনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জামের অচলাবস্থা। হাসপাতালের সাতটি এনজিওগ্রাম মেশিনের তিনটি নষ্ট, আর একমাত্র সিটি এনজিওগ্রাম মেশিনটি সাত-আট বছর ধরে অচল পড়ে আছে। পাশাপাশি রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ বা ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়েও চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্লাড ব্যাংক রক্তদাতাদের নির্ধারিত স্ক্রিনিংয়ের বাইরেও অতিরিক্ত ৭০০ টাকার প্যাকেজে বিভিন্ন পরীক্ষা করছে, যা মূলত প্যাথলজি বিভাগের কাজ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
অচল সিটি এনজিওগ্রাম মেশিন
হৃদরোগের চিকিৎসায় এনজিওগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাসপাতালের সাতটি এনজিওগ্রাম মেশিনের তিনটি অচল পড়ে আছে। তবে সরকার নতুন দুটি মেশিন বরাদ্দ দিয়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো একমাত্র সিটি এনজিওগ্রাম মেশিনটি সাত-আট বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে থাকা। এ বিষয়ে ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিটি এনজিওগ্রাম মেশিনটি চালু করা খুব জরুরি। নতুন দুটি মেশিন চালু হলে সাধারণ এনজিওগ্রামের চাপ হয়তো কমবে, কিন্তু সিটি এনজিওগ্রামের প্রয়োজনীয়তা আলাদা।’ তবে হাসপাতালের নিজস্ব প্যাথলজি বিভাগে যন্ত্রপাতির বড় কোনো সংকট নেই বলে তিনি দাবি করেন।
রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
চিকিৎসাসেবার এই সংকটের মধ্যেই ব্লাড ব্যাংকের বিরুদ্ধে এখতিয়ার-বহির্ভূত ল্যাব-বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন হাসপাতালেরই বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্যমতে, আইন অনুযায়ী ব্লাড ব্যাংকের একমাত্র কাজ হলো রক্তদাতাদের পাঁচটি প্রাথমিক স্ক্রিনিং টেস্ট (এইচবিএসএজি, এইচসিভি, এইচআইভি, ভিডিআরএল ও ব্লাড গ্রুপিং) করা। কিন্তু তারা এই নির্ধারিত কাজের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ৭০০ টাকার প্যাকেজে প্রতিদিন এনজিওগ্রাম (পিসিআই), বাইপাস সার্জারি, লিভার-সংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন পরীক্ষাও করছে, যা অবৈধ। এসব পরীক্ষা প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের করার কথা। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ব্লাড ব্যাংক প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১০০টি অতিরিক্ত প্যাকেজ টেস্ট করছে। এতে মাসে প্রায় ২০ লাখ এবং বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্লাড ব্যাংক হাইকোর্টের একটি রায়ের দোহাই দিয়ে নিজস্ব তহবিলে এই বিপুল অর্থ জমা করছে এবং কিছু অসাধু লোক তা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছে। এর ফলে প্যাথলজি বিভাগের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকছে।
এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রক্তদাতাদের নির্ধারিত স্ক্রিনিং পরীক্ষার বাইরে অন্য পরীক্ষা করার এখতিয়ার ব্লাড ব্যাংকের নেই।’ তবে, তিনি জানান, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে দায়িত্ব নেওয়ায় অনেক অভিযোগের নথি তার কাছে নেই।
জনবল সংকট ও সেবায় প্রভাব
অতিরিক্ত রোগীর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীর সংকটেও ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক সেবা। ডা. মিজানুর রহমান জানান, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতি পূরণে ১০০ জন এবং নিরাপত্তা জোরদারে আরও ১৫০ জন কর্মী চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া অ্যানিস্থিশিয়া, প্যাথলজি, অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি বিভাগে চিকিৎসকের কিছু পদ খালি রয়েছে। রোগীদের ভোগান্তি কমাতে সম্প্রতি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টিকিট কাউন্টার ও বহির্বিভাগের কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ ও ওষুধ নেওয়ার অভিযোগে আউটসোর্সিংয়ের দুজন কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত এবং অন্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান সহকারী পরিচালক।
রোগীর বাড়তি চাপ সামলাতে শয্যা বাড়ানো, অচল সিটি এনজিওগ্রাম মেশিন সচল করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং ব্লাড ব্যাংকের অর্থ আদায়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে হৃদরোগের মতো স্পর্শকাতর চিকিৎসায় রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।