টানা ১৬ দিনের সড়ক অবরোধে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সাজেকে যাওয়ার একমাত্র সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। বন্ধের মুখে পর্যটন ব্যবসা, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শত শত শ্রমিক ও কর্মচারী। দীর্ঘ অচলাবস্থায় স্থানীয়দের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে খাগড়াছড়ির পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে স্থগিত করা হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় আয়োজন দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসব।
পাল্টাপাল্টি অবরোধে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত
সাজেকে অচলাবস্থার সূত্রপাত কয়েকটি আঞ্চলিক সংগঠনের পাল্টাপাল্টি অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে সড়ক অবরোধ চলছে। এর পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে ৪ ও ৫ নভেম্বর ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ পালন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। প্রথম পক্ষের অবরোধে কৃষিপণ্য পরিবহন ও শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহন চলাচলে ছাড় দেওয়া হলেও সাধারণ যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। দুই পক্ষের কর্মসূচিতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ব্যাহত হচ্ছে জরুরি যাতায়াত, চিকিৎসাসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলি
এদিকে সাজেকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ৩১ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাচলংয়ের কলাবুনিয়া ও কজোইছড়ি এলাকায় এ সংঘর্ষ হয়। তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
সমঝোতার উদ্যোগেও কাটেনি অচলাবস্থা
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গত ২৬ অক্টোবর উজো বাজারে প্রশাসন ও অবরোধকারীদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অবরোধকারীদের পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও একটি দাবি অমীমাংসিত থেকে যায়। বৈঠকে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে এক পক্ষ অবরোধ শিথিল করলেও পাল্টা কর্মসূচির কারণে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ফিরে আসেনি।
পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা। পর্যটকের অভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শত শত শ্রমিক ও কর্মচারী। অবিক্রীত খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় রিসোর্ট ও কটেজে কর্মরতদের খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে পর্যটকেরা ভ্রমণ বাতিল করায় খাগড়াছড়ি শহরের হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটকবাহী যানবাহনের ব্যবসায়ও মন্দা দেখা দিয়েছে।
খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘদিন যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাজেকের বাজারগুলোতে চাল, চিনি, ডাল ও সয়াবিন তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ কমে আসছে। জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় দোকানি জনসিম চাকমা জানান, তাঁর দোকানে চাল ও চিনি শেষ হয়ে গেছে। পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় নতুন করে মালামাল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, কিছু এলাকায় খাদ্যসংকটের আশঙ্কা রয়েছে। জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। বাঘাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানও খাদ্যসংকটের খবর পেলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
নিরাপত্তার কারণে স্থগিত কঠিন চীবর দান উৎসব
সড়ক অবরোধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে সাজেকের ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনেও। নিরাপত্তাজনিত কারণে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান দানোত্তম কঠিন চীবর দান উৎসব স্থগিত করা হয়েছে। দীর্ঘ অচলাবস্থায় শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ধর্মীয় কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
রূপক/ ৭ নভেম্বর ২৬