বিশ্ব ফুটবলে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করেছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। অসংখ্য রেকর্ড, ব্যক্তিগত পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক সাফল্যে নিজেদের নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিদায়পর্ব ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন বড় প্রশ্ন—পরবর্তী সময়ে বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্ব দেবেন কারা? নতুন প্রজন্মের চার তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, হ্যারি কেইন ও লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সেই আলোচনা।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড তার দখলে। তার নেতৃত্বে ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জেতে পর্তুগাল।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল করেছেন লিওনেল মেসি। তার নেতৃত্বেই ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। এ ছাড়া ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন বিশ্ব ফুটবলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জাতীয় দলের হয়ে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন মাত্র দুবার। দুটি ম্যাচই ছিল প্রীতি ম্যাচ। ২০১১ সালে জেনেভায় প্রথম দেখায় ২-১ গোলে জেতে আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচে মেসি ও রোনালদো দুজনই গোল করেন। ২০১৪ সালে ম্যানচেস্টারে দ্বিতীয় ম্যাচে ১-০ গোলে জয় পায় পর্তুগাল। সেই ম্যাচে অবশ্য দুজনের কেউই গোল পাননি।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এএস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসি-রোনালদোর রেখে যাওয়া রেকর্ড ও উত্তরাধিকার বহনের সম্ভাবনায় আলোচনায় রয়েছেন চার ফুটবলার—কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, হ্যারি কেইন ও লামিনে ইয়ামাল। প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব শক্তি, অর্জন ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
**হালান্ড: গোলের পর গোল, ইতিহাসের পথে নরওয়েজীয় তারকা**
নতুন প্রজন্মের অন্যতম ভয়ংকর গোলস্কোরার আর্লিং হালান্ড। নরওয়ের এই স্ট্রাইকার মাত্র ৫৯ আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ৬৫ গোল। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে একটির বেশি গোল করার অসাধারণ গড় নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই ফরোয়ার্ড।
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি জাতীয় দলকেও সাফল্য এনে দিয়েছেন হালান্ড। তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানে ২৮ বছর পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে।
দেশটির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। ছাড়িয়ে গেছেন আগের রেকর্ডধারী ইয়র্গেন ইউভেকে, যার গোলসংখ্যা ছিল ৩৩। বর্তমানে প্রায় প্রতি ৭১ মিনিটে একটি করে গোল করছেন হালান্ড। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আরও অনেক রেকর্ড গড়ার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।
**এমবাপ্পে: রেকর্ড ও শিরোপায় উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনা**
মেসি-রোনালদোর উত্তরসূরি হওয়ার আলোচনায় কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম সামনে আসছে জোরেশোরে। ফ্রান্সের অধিনায়ক ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
ফ্রান্সের হয়ে ১০৭ ম্যাচে ৬৭ গোল করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তিনি ছাড়িয়ে গেছেন অলিভিয়ের জিরুকে, যার গোলসংখ্যা ৫৭। সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই এমবাপ্পে; তার অ্যাসিস্টসংখ্যা ৪০।
বিশ্বকাপেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য অর্জন। বিশ্বকাপের ফাইনালে তিন আসর মিলিয়ে করেছেন ৪ গোল। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও পেয়েছেন তিনি। ২৭ বছর বয়সী এই তারকার সামনে এখনো দীর্ঘ ক্যারিয়ার পড়ে রয়েছে। ফলে গোল ও শিরোপার সংখ্যায় নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি মেসি-রোনালদোর রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগও রয়েছে তার।
**হ্যারি কেইন: গোলের রেকর্ড আছে, বড় শিরোপার অপেক্ষা**
বয়স ৩৩ হলেও রেকর্ডের আলোচনায় হ্যারি কেইনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় দলের আক্রমণভাগের নির্ভরযোগ্য মুখ।
ইংল্যান্ডের হয়ে ১২৫ ম্যাচে ৯১ গোল করেছেন এই স্ট্রাইকার। জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও তার দখলে। ছাড়িয়ে গেছেন সাবেক তারকা ওয়েইন রুনির ৫৩ গোলের কীর্তি। জাতীয় দলের হয়ে তার অ্যাসিস্টসংখ্যা ২৩।
ব্যক্তিগত অর্জনে সমৃদ্ধ হলেও বড় শিরোপার অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি কেইনের। ইংল্যান্ডের হয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। তাই ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাশাপাশি দলীয় সাফল্য অর্জনই এখন তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
**লামিনে ইয়ামাল: অল্প বয়সেই ভবিষ্যতের তারকা**
চার ফুটবলারের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী লামিনে ইয়ামাল। তবে বয়সে তরুণ হলেও প্রতিভা ও পারফরম্যান্স দিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্ব ফুটবলে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন বার্সেলোনার এই উইঙ্গার।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্পেনের জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। এখন পর্যন্ত ৩৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ১১ গোল। সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়েছেন আরও ১৩টি।
স্পেনের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে ইয়ামালের। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত গোলটি টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে আছে। ওই ম্যাচে স্পেন ২-১ গোলে জয় পেয়ে ফাইনালে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপাও জেতে।
ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন পারফরম্যান্স ইয়ামালকে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত করেছে। সামনে দীর্ঘ সময় থাকায় আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল, অ্যাসিস্ট ও শিরোপার সংখ্যায় আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তার।
নতুন যুগে কার হাতে থাকবে ফুটবলের নেতৃত্ব?
মেসি ও রোনালদোর অর্জন কেবল গোল কিংবা ব্যক্তিগত রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, দলকে শিরোপা জেতানো এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক তৈরি করার মধ্য দিয়ে তারা ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন।
এমবাপ্পে, হালান্ড, কেইন ও ইয়ামাল প্রত্যেকেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। তবে মেসি-রোনালদোর মতো দীর্ঘ সময় শীর্ষ পর্যায়ে থাকা এবং তাদের সামগ্রিক অর্জনের সমপর্যায়ে পৌঁছানো যে কঠিন চ্যালেঞ্জ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন প্রজন্মের এই তারকাদের মধ্য থেকে কে ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ হয়ে উঠবেন, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।